agrobangla
×

Warning

Error loading component: com_finder,

bina til

বাংলাদেশে তিল দ্বিতীয় প্রধান তৈল বীজ ফসল হিসেবে পরিগণিত। তিলের তেলের স্বাদ ও গন্ধ সুমিষ্ট এবং পচনরোধী উঁচুমানের ভোজ্য তেল। খাদ্য হিসেবেও তিল বীজ জনপ্রিয়। একক বা মিশ্র ফসল হিসেবেও স্ব-পরাগায়ণ প্রকৃতির উদ্ভিদ। তিল চাষ করে কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পুষ্টি সমস্যা নিরসনে এটি অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধান ভিত্তিক ফসল পরিক্রমায় তিল চাষে কোন অসুবিধা হয় না।

বিদেশ হতে সংগৃহীত একটি জার্মপ্লাজমে গামারশ্মি প্রয়োগ করে উন্নত লাইন নির্বাচন এবং নির্বাচিত লাইনটিকে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিনা তিল-১ নামে নতুন এ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাতটি স্থানীয় আবাদি জাত টি-৬ অপেক্ষা প্রায় দেড়গুণ বেশি ফলন দেয়।

বিনা তিল-১ এর গাছ শাখাবিহীন এবং পাতার রঙ ঘন সবুজ। প্রতিটি গিরায় ৩-৬ বড় আকারের লম্বা ফল ধরে। বীজাবরণ পাতলা, নরম ও ক্রীম রঙের বিধায় খোসা না ছড়িয়েও কারখানা বা বেকারিতে সরাসরি ব্যবহার করা যায়। বেকারিতে বিনা তিলের চাহিদাও প্রচুর। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৫০-৫২ ভাগ। জীবনকাল ৮৫-৯০ দিন। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১৩০০ কেজি (একর প্রতি ৫৩০ কেজি বা বিঘা প্রতি ১৭৫ কেজি)।

বাংলাদেশের উপকূলীয় বিশাল লবণাক্ত এলাকা বছরের প্রায় ছমাস (ডিসেম্বর থেকে জুন) পতিত থাকে। এ সময়ে অর্থাৎ খরিফ-১ মৌসুমে বিনা তিল-১ এর লবণাক্ততা সহিষ্ণুতার কারণে এর চাষ করে বাংলাদেশে তেলবীজের বিরাট ঘাটতি বহুলাংশে লাঘব করা যেতে পারে। দেশের বৃহত্তম জেলাসমূহ যেমন- ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, জামালপুর ও পার্বত্য জেলাসমূহে বিনা তিল-১ চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। আউস ধান, আখ ও গ্রীষ্মকালীন মুগের সাথে সাথী ফসল হিসেবেও বিনা তিল-১ চাষ করা যায়।

বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি বিনা তিল-১ চাষের জন্য উপযোগী। এই ফসল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তবে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে সকল প্রকার মাটিতেই জাতটি চাষ করা যেতে পারে ।

তিল কুয়াশা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না কিন্তু যথেষ্ট খরা সহিঞ্চু। যদি তাপমাত্রা ২৫-৩৫ সেলসিয়াসের নীচে নামে তাহলে বীজ গজাতে দেরী হয় এবং চারাগাছ ঠিকমত বাড়তে পারে না। বাড়ন- অবস্থায় অনবরত বৃষ্টিপাত হলে তিল গাছ মরে যায়। খরিপ মৌসুমে বীজ বপনের ৩৫-৩০ দিনের মধ্যে তিল গাছে ফুলের কুঁড়ি আসে এবং ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ফোটা শুরু হয়।

সাধারণত ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালভাবে ঝুরঝুরে এবং জমি সমান করে বিনা তিল-১ এর বীজ বপন করতে হয়। মুগসহ অন্যান্য ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করলে প্রধান ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে হবে।

মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ (মধ্য ফাগুন) বিনা তিল-১ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে উঁচু শ্রেণীর জমিতে ভাদ্র/আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়েও বিনা তিল-১ চাষ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রচণ্ড শীত শুরুর আগেই ফসল কর্তন করতে হবে।

ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৯ কেজি (একর প্রতি ৩-৩.৫ কেজি) এবং সারিতে বপন করার জন্য ৭ কেজি (একর প্রতি ২.৫-৩.০ কেজি) বীজ যথেষ্ট। তবে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করার সময় উভয় ফসল কি হারে বা কত সারি পর পর কোন ফসলের বীজ বপন করা হবে, তার উপর নির্ভর করে বীজের হার নির্ধারণ করতে হবে।

জমিতে রস বেশি হলে অল্প গভীরে বীজ বপন করলে বীজ পচে না। মাটি শুষ্ক হলে বপনের পূর্বে একটি হলকা সেচ দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে।

বিনা তিল-১ এর বীজ ছিটিয়ে বা সারিতে বপন করা যেতে পারে। বীজ ও শুকনো বালু একত্রে মিশিয়ে ছিটিয়ে বপন করলে সমান দূরত্বে বীজ ফেলতে সুবিধে হয়। বিনা তিল-১ এর জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫ সেন্টিমিটার দিতে হবে। বীজ বপনের ২ দিনের মধ্যে অংকুরোদগম ঘটে এবং ৩-৪ দিনের মধ্যে মাটির উপর উঠে আসে। জমিতে চারা যদি ঘন হয় তবে ১৫ দিনের মধ্যে গাছ তুলে পাতলা করে দিতে হবে।

বিনা তিল-১ চাষে সারের মাত্রা নির্ভর করে জমির ধরণ ও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের উপর। সাধারনত বিনা তিল-১ চাষে একর প্রতি ইউরিয়া- ৪০-৫০ কেজি, টিএসপি- ৩৬-৪৮ কেজি, এমপি- ২০-৩০ কেজি, জিপসাম- ৫০-৬০ কেজি, জিংক সালফেট- ১-২ কেজি ও বোরন- ০.৪-০.৮ কেজি হারে প্রযোগ করতে হবে।

বোরন ঘাটতি এলাকায় হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি হারে বরিক এসিড প্রয়োগ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। জমি প্রস্তুতকালে অর্ধেক ইউরিয়া এবং পূর্ণ মাত্রায় অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া সার বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

অধিক ফলন পেতে হলে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। চারা অবস্থায় প্রায় ২০ দিন পর্যন- তিল গাছের বৃদ্ধি ধীর গতিতে হতে থাকে। এ সময় জমির আগাছা দ্রুত বেড়ে তিল গাছ ঢেকে ফেলতে পারে। তাই বীজ বপনের পূর্বেই জমিকে ভালভাবে আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে। প্রয়োজনে সর্তকতার সাথে নিড়ানী দিয়ে আগাছা তুলে ফেলতে হবে।

সাধারনত বিনা তিল-১ চাষাবাদে সেচের প্রয়োজন হবে না। বপনের সময় মাটিতে রসের অভাব থাকলে একটি হালকা সেচ দিয়ে বীজ গজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর ২৫-৩০ দিন পর ফুল আসার সময় জমি শুষ্ক হলে একবার এবং ভীষণ খরা হলে ৫৫-৬০ দিন পর ফল ধরার সময় আর একবার সেচ দিতে হবে। তিল ফসল জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই জমির মধ্যে মাঝে মাঝে নালা কেটে বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ফসলকে রক্ষা করতে হবে ।

রোগবালাই দমন : কাণ্ড পচা রোগ এবং বিছা পোকা ও হক মথ তিল ফসলের ক্ষতি করতে পারে। কাণ্ড পচা রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে বাজারে যেসব ছত্রাকনাশক পাওয়া যায়, যেমন রেভিস্টিন এক গ্রাম বা ডাইথেন এম-৪৫, ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পরপর তিনবার দুপুর ২-৩ টার সময় জমিতে ছিটিয়ে রোগটি দমন করা যেতে পারে। বিছাপোকা দমনের জন্য ডিম পাড়ার সাথে সাথে আক্রান- পাতা ছিঁড়ে কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে কার্যকরভাবে মেরে ফেলা যেতে পারে। সাইথ্রিন-১০ ইসি বা সবিক্রন-৪২৫ ইসি প্রয়োগ করে দমন করা যেতে পারে।

ফসল কাটা: বিনাতিল-১ পাকার সময় পাতা, কাণ্ড ও ফলের রঙ হলুদাভ হয় এবং বীজের খোসা ধূসর বর্ণ ধারণ করে। তিল ফসলের প্রতিটি গাছের সব বীজ এক সঙ্গে পাকে না। গাছের গোড়ার দিকের বীজ আগে পাকে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকের বীজ পাকাতে শুরু করে ।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের বাস-ব উপায় হল, গাছের নীচের অংশের বীজ যখন পাকা শুরু করে তখন ফসল কেটে বাড়ির উঠানে কয়েকদিন স-ূপ করে রেখে দিলে উপরের দিকের বীজও পেকে যায়। তারপর তিল গাছ রৌদ্রে শুকিয়ে লাঠির সাহায্যে পিটিয়ে মাড়াই করতে হবে। এরপর বীজ ভালভাবে ৪-৫ দিন টানা রৌদ্রে ৩-৪ ঘন্টা করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।

তিল ফসল কর্তনের ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিলম্বে ফসল কাটা হলে বীজ ক্ষেতে ঝরে পড়ে, আবার আগাম কাটা হলে অনেক বীজ অপরিপক্ক থেকে যায়, উভয় ক্ষেত্রেই ফলন হ্রাস পায়।

বীজ সংরক্ষণ: বীজের মান ভাল রাখার জন্য পরিষ্কার বীজ পুরু বা শক্ত পলিথিন ব্যাগে ভরে মুখ বেঁধে অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে কম আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণকালে বীজের আর্দ্রতা অবশ্যই শতকরা ৮ থেকে ৯ ভাগ হতে হবে। আরও ভাল হয় যদি ব্যভিস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে) দিয়ে বীজ শোধন করে সংরক্ষণ করা যায়। এভাবে সংরক্ষিত বীজের মান ভাল থাকে এবং অংকুরোদগম ক্ষমতা সহজে নষ্ট হয় না।

লেখক: ড. নিয়াজ পাশা, কৃষি বিজ্ঞানী, বিনা, ময়মনসিংহ
তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক