agrobangla
×

Warning

JLIB_APPLICATION_ERROR_COMPONENT_NOT_LOADING

JLIB_APPLICATION_ERROR_COMPONENT_NOT_LOADING

ইঁদুর নিধন বা নিয়ন্ত্রণ দুই উপায়ে করা যায়।
এক. অরাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় এবং
দুই. রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায়।
তবে ইঁদুর নিধন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নির্ভর করে মূলত ইঁদুরের প্রজাতি, ক্ষতির ধরন, পরিমাণ, ফসলের অবস্থা এবং সময়ের ওপর। আবার অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর নাও হতে পারে বা একাধিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের দরকার হতে পারে।

অরাসায়নিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা :
ইঁদুরের উপস্থিতি : বসতবাড়ি, গুদাম বা মাঠে এদের উপস্থিতি সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয় এবং উপস্থিতি বুঝা মাত্রই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হয়।

বসতবাড়ি বা ক্ষেত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে : পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে ইঁদুর থাকে না। তাই বসতবাড়ির নোংরা আবর্জনা সরিয়ে বা ক্ষেত আগাছামুক্ত রেখে ইঁদুরের উপস্থিতি সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

বসতবাড়ি বা ক্ষেতের আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে : বসতবাড়ি বা এর আশপাশের অবাঞ্ছিত ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করে, খাবার-দাবার ঢেকে রেখে, উচ্ছিষ্ট খাবার যেখানে-সেখানে না ফেলে এবং মাঠে ক্ষেতের আশপাশের ও আইলের বড় ঘাস বা আগাছা বা ঝোপ-জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে পরোক্ষভাবে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

আইল চিকন রেখে : ক্ষেতের আইল ছেঁটে চিকন বা ছোট ছোট করে রাখলে ইঁদুর আইলে গর্ত করে অবস্থান করতে পারে না এবং পরোক্ষভাবে ক্ষেতে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ হয়।

ফাঁদ পেতে ইঁদুর ধরে : ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে বিভিন্ন জাতের ইঁদুর মেরে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ইঁদুর সাধারণত ঘরের দেয়াল ঘেঁষে চলাচল করে থাকে। চলাচলের রাস্তায়, মাচায় বা ঘরের যেসব জায়গায় ইঁদুরের আনাগোনা বেশি সেখানে এবং মাঠে সদ্য মাটি তোলা গর্তের ৩০ সেমি. দূরে ফাঁদ স্থাপন করতে হয়। বিভিন্ন ধরনের ফাঁদের মধ্যে চিটাগুড়ের কলসি ফাঁদ, কাঠ বা লোহার তৈরি ফাঁদ, লাউয়ের খোলস দিয়ে তৈরি ফাঁদ, সটকি কল, ক্যাচি কল ইত্যাদি। ফাঁদে শুঁটকি মাছ, নারিকেল শাঁস, বিস্কুট, রুটি ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়।

গর্তে পানি ঢেলে : ইঁদুরের গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুরকে গর্তের বাইরে এনে মারা সম্ভব।

গর্ত খুঁড়ে : ইঁদুরের উপস্থিতি আছে বা সদ্য তোলা গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর মেরে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সাধারণত ফসল ক্ষেতে বা ক্ষেতের আইলের গর্ত খুঁড়ে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। মাঠে ফসল থাকা অবস্থায় ব্যবস্থা নিতে গেলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে, তাই ফসল সংগ্রহ শেষে এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে হয়।

ধোঁয়া দিয়ে : ক্ষেত থেকে ধান বা গম সংগ্রহ শেষে শুকনো মরিচ পুড়িয়ে সেটি সঙ্গে সঙ্গে গর্তের মুখে ধরলে বা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলে যে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, তা ইঁদুরকে বাইরে বের হয়ে আসতে বাধ্য করে। বাইরে বের হওয়া ইঁদুর পিটিয়ে মেরে ফেলতে হয়।

একসঙ্গে চাষ করাঃ একই জাতীয় ফসল মাঠে একসঙ্গে চাষ করলে এবং একই সময়ে সংগ্রহ করলে দীর্ঘসময় পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে ইঁদুরের জন্মহার কমে গিয়ে পরোক্ষভাবে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ হয়।

প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা : বসতবাড়ি, গুদাম বা যেখানে খাবার জাতীয় জিনিস রাখা হয়, সেসব স্থানে ঢোকার পথে যেসব ফাঁক থাকে প্রয়োজনানুযায়ী ধাতব পাত দিয়ে বা চিকন বুননের তারের জাল দিয়ে সেসব স্থানে অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যায়।

আঠা ফাঁদ ব্যবহার করা : ইঁদুর ধরার জন্য ঘরে বা গুদামে কাঠবোর্ড, মোটা শক্ত কাগজ, সমান টিন, হার্ডবোর্ড ইত্যাদির ওপর বিষমুক্ত আঠা লাগিয়ে রাতে ইঁদুর চলাচলের রাস্তায় রেখে দিতে হয় অথবা মাঝে লোভনীয় খাবার রেখে চারদিকে আঠা দিয়ে বৃত্ত তৈরি করা হয়। খাবার খেতে এসে আঠায় ইঁদুর আটকে যায়। আটকে পড়া ইঁদুর মেরে ফাঁদের লোমগুলোকে পুড়িয়ে ফাঁদে আরো আঠা যুক্ত করে ফাঁদটি আবার ব্যবহার করা যায়।

জৈবিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে : অনেক পরভোজী প্রাণী আছে যারা ইঁদুর ধরে খায়। যেমন- বিড়াল, পেঁচা, ঈগল, বনবিড়াল, শিয়াল, বেজি, সাপ, গুইসাপ ইত্যাদি প্রচুর ইঁদুর ধরে খায়। পরিবেশে এসব উপকারী প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে ইঁদুরের সংখ্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

ইঁদুর নিধন কর্মসূচির মাধ্যমে : প্রতিবছর ২-৩ বার বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফসলে ইঁদুরের উৎপাত শুরু হওয়ার আগেই ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। এ জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি ইঁদুর নিধনের জন্য ইঁদুরের বিষটোপ বা ফাঁদ প্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রাসায়নিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা : পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর নিধন কার্যক্রম চলে আসছে। বিষক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে রাসায়নিক পদ্ধতিকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়।
১. তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ
২. দীর্ঘমেয়াদি বিষ

বাংলাদেশে যেসব অনুমোদিত বিষ বাজারে পাওয়া যায় তাদের মধ্যে জিংক ফসফাইডই তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ। এ বিষ খেলে ইঁদুর সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। মৃত ইঁদুরও বিষটোপ স্থাপনের জায়গার আশপাশে পড়ে থাকে। কৃষকেরা তাই এই ধরনের বিষটোপ বেশি পছন্দ করে থাকেন। সদ্য মাটি তোলা গর্তের আশপাশে বিকেলে কাগজের বা গাছের পাতার ওপর ৫ গ্রাম পরিমাণ জিংক ফসফাইড বিষ রেখে দিলে ইঁদুর সন্ধ্যার পর পরই গর্ত থেকে বের হয়ে এসে খায় এবং মরে যায়। আবার গর্তের মুখের মাটি সরিয়ে দিয়ে ৫ গ্রাম বিষটোপ কাগজের পুঁটলিতে বেঁধে গর্তের ভেতরে ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে দিতে হয়। ইঁদুর কাগজের পুঁটলিসহ বিষটোপ ভেতরে নিয়ে যায় এবং বাচ্চাসহ খেয়ে মারা যায়। তবে এই বিষটোপ পর পর দুদিনের বেশি ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ মরা ইঁদুর দেখলে অন্য ইঁদুরেরা আর বিষটোপের জিনিস খেতে চায় না। বিষটোপ ব্যবহারের আগে বিষবিহীন টোপ ২-৩ দিন ব্যবহার করে ইঁদুরের খাবার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে পরে বিষটোপ ব্যবহারে তার কার্যকারিতা বাড়ে।

দীঘমেয়াদি বিষ আবার দুই ধরনের। একমাত্রা বিষ যেমন ক্লের্যা ট, স্টর্ম যা ইঁদুর একবার খেলেই মারা যায় এবং বহুমাত্রা বিষ, যা ইঁদুরকে একাধিকবার খেতে হয়, যেমন- ল্যানির্যা ট, ব্রমাপয়েন্ট, রেকুমিন। এসব দীর্ঘমেয়াদি বিষই ইঁদুরের দেহের রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। এতে ইঁদুরের দেহের বাইরে ও ভেতরে অনবরত রক্তক্ষরণের মাধ্যমে ইঁদুর দুর্বল হয়ে মারা যায়। এসব বিষ গর্তের বাইরে পাত্রে রেখে দিলে ইঁদুর বার বার খায় ও পরে অন্য কোথাও বা গর্তের ভেতরেই মরে পড়ে থাকে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি বিষ খেয়ে ইঁদুরের মরতে প্রায় ১-১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। তবে ৫-৭ দিনের মধ্যেই অধিকাংশ ইঁদুর মরে যায়। এ ছাড়াও অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বাজারে ট্যাবলেট আকারে ফসটক্সিন, সেলফস, কুইকফস, কুইকফিউম, ডেসিয়াগ্যাস এক্সটি ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়। যেসব গর্তে ইঁদুর আছে, সেসব গর্তের ভেতরে একটি ট্যাবলেট রেখে গর্তের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। আশপাশের নতুন-পুরাতন সব গর্তের মুখও ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হয়, যাতে বাতাস চলাচল একেবারেই বন্ধ থাকে। গর্তের ভেজা বাতাসের সঙ্গে ট্যাবলেট মিশে ফসফাইন নামক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে, যা যে কোনো জীবিত প্রাণীর ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করার ফলে ওই প্রাণীটি মারা যায়। ইঁদুরের সমস্যা একটি জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবিলার জন্য অবশ্যই সকলকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। ইঁদুর নিধন করে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে মূল্যবান ফসল রক্ষার পাশাপাশি বসতবাড়ির সম্পদ এবং অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষারও ব্যবস্থা নিতে হবে।
লেখক: খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম