ব্রোকলি

শীতের সবজি ব্রোকলি

শীতের সবজি ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপি

ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপি এদেশে একটি নতুন কপিজাতীয় সবজি। শীতকালীন সবজির মধ্যে ব্রোকলি বর্তমানে আমাদের দেশে চাষ করা হচ্ছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Brassica oleracea var. italica.

ব্রোকলি অন্যসব কপি জাতীয় সবজির চেয়ে উন্নত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী ব্রোকলিতে ৫.৫ গ্রাম শ্বেতসার, ৩.৩ গ্রাম প্রোটিন, ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩৫০০ আইইউ ভিটামিন এ রয়েছে। এছাড়াও ব্রোকলিতে প্রচুর পরিমাণ আয়রন ও ক্যালসিয়াম বিদ্যমান। ব্রোকলি অত্যনত্দ উপাদেয়, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর একটি সবজি। এটি চোখের রোগ, রাতকানা, অস্থি বিকৃতি প্রভৃতির উপসর্গ দূর করে ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

জমি তৈরি: ব্রোকলি চাষের জন্য জৈব সার সমৃদ্ধ, সুনিষ্কাশিত, উর্বর দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটিযুক্ত জমি নির্বাচন করা উত্তম। জমিতে মাটির পিএইচ মান ৬ থেকে ৭, দিনে গড় তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ব্রোকলি চাষের জন্য উত্তম। জমিতে কয়েকবার আড়াআড়ি ও গভীর চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। এরপর আগাছা পরিস্কার ও জমি সমান করে বেড তৈরি করতে হবে।

জাত নির্বাচন: ব্রোকলি আমাদের দেশে নতুন সবজি। কাজেই এখন পর্যন- তেমন কোন ভাল জাত আমাদের দেশে নেই। উন্নত বিশ্বের বেশ কয়েকটি জাত যেমন- প্রিমিয়াম ক্রস, গ্রীন কমেট, জুপিটার প্রভৃতি জাতের ব্রোকলি চাষ করা যায়। লালতীর সীডস লিমিটেড ‘লিডিয়া’ নামে ব্রোকলির একটি জাত বাজারজাত করছে, যা আমাদের দেশের আবহাওয়া উপযোগী। জাতটি দ্রুত বর্ধনশীল, মাঝারি আকৃতির, তাপ সহিষ্ণু ও রোগ প্রতিরোধী, দেখতে আকর্ষণীয় ও খেতে সুস্বাদু।

বীজ বপন: আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ব্রোকলি চাষের উত্তম সময় হল আশ্বিন থেকে পৌষ মাস। চারা রোপণের আগে বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) প্রায় ৫০ গ্রাম বীজ বপন করে বীজতলায় চারা তৈরি করতে হবে। এরপর মূল জমিতে চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ৬ হাজার চারা রোপণ করতে হবে। প্রায় ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ বয়সের চারা সারি থেকে সারি ৫৫ সে.মি. ও চারা থেকে চারা ৪৫ সে.মি. দূরত্বে রোপণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ৩০ সে.মি. চওড়া এবং ১৫ সে.মি. গভীর নালা রাখতে হবে।

সার প্রয়োগ: ব্রোকলির উত্তম ফলন পেতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান অবশ্যই দরকার। এজন্য জমি তৈরির সময় ও পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জৈবসার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। ব্রোকলি চাষের মূল জমি তৈরির সময় বিঘাপ্রতি ২ টন পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার, ২৫ কেজি খৈল, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫ কেজি টিএসপি, ২০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও পরিমাণমত জিপসাম, জিংক ও বোরন সার এবং বিঘাপ্রতি ২ কেজি হারে রুটোন বা অন্য কোন শিকড় বর্ধনকারী হরমোন প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির সময় জিংক ও বোরন না প্রয়োগ করে চারা লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিন পর প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম লিবরেল জিংক ও ২০ গ্রাম লিবরেল বোরন একত্রে মিশিয়ে সপ্রে করা যায়। তবে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করা উত্তম।

অন্যান্য পরিচর্যা: ব্রোকলির চারা লাগানোর পর বেশকিছু বাড়তি পরিচর্যা করতে হবে। জমিতে আগাছা হলে সাথে সাথে নিড়ানি দিতে হবে। মাঝে মাঝে নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা করে দিতে হবে। এছাড়া সূর্যালোকে উম্মোচিত থাকলে ফুল হলুদাভ বর্ণ ধারন করতে পারে। তাই চারদিকের পাতা দিয়ে ফুল ঢেকে দিতে হয়, যা ব্লাচনিং নামে পরিচিত। অনেক সময় আগাম জাতের ব্রোকলি দেরিতে রোপণ করলে বা জমিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হলে ফুল ছোট হয়ে যেতে পারে। এসময় ইনডোল বিউটারিক এসিড জাতীয় জৈব হরমোন সপ্রে করলে বা ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের পর সেচ দিলে উপকার পাওয়া যায়।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন: চারা রোপণের দুই মাসের মধ্যে ব্রোকলির অগ্রীয় প্রোপুষ্প মঞ্জুরী খাওয়ার জন্য সংগ্রহ করা যায়। তবে সঠিকমানের জৈব হরমোন ব্যবহার করলে প্রায় ১০ দিন আগে ফসল সংগ্রহ করা যায়। প্রায় তিন ইঞ্চি কাণ্ডসহ ধারালো ছুরি দিয়ে ফুল কেটে সংগ্রহ করতে হয়। এর ১০ থেকে ১২ দিন পর পর্যায়ক্রমে বোঁটাসহ কক্ষীয় প্রোপুষ্পমঞ্জুরী সংগ্রহ করতে হয়। সঠিক পরিচর্যা করলে বিঘাপ্রতি ২থেকে ২.৫ টন ফলন পাওয়া যায়।
লেখক: কৃষিবিদ মোঃ কামরুল আহসান ভূঁইয়া
এগ্রোবাংলা ডটকম