পলোনিয়া

এক অবাক বৃক্ষের নাম পলোনিয়া

কাঠের গাছ রোপণ করে তা থেকে আয় পেতে এখন আর তিনযুগ অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। মাত্র ৮-১০ বছরে আপনি পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায়। আর এজন্য প্রয়োজন উঁচু জমি, অদম্য আগ্রহ, লাগসই প্রযুক্তি এবং ‘পলোনিয়া’ নামক গাছের চারা। ‘পলোনিয়া’ একটি বিস্ময়কর বৃক্ষ। যা রোপণের মাত্র ৮-১০ বছরের মধ্যে পূর্ণতা লাভ করে। উত্কৃষ্ট মানের কাঠের জন্য যেসব বৃক্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা হয় তার মধ্যে ‘পলোনিয়া’ বৃক্ষ সর্বাধিক দ্রুত বর্ধনশীল, মজবুত, টেকসই, দৃষ্টিনন্দন, ওজনে হালকা এবং এর কাঠ তুলনামূলকভাবে অধিক দামে বিক্রি হয়ে থাকে। অনুকূল পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে চারা রোপণের পর প্রথম বছরে এই গাছ ১০-১৬ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

দ্বিতীয় বছরে বৃদ্ধি পায় ৫-১০ ফুট। এভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে একটি ‘পলোনিয়া’ গাছের ১০ বছরে উচ্চতা দাঁড়ায় ৫০-৬০ ফুট।
আমাদের দেশে অন্যান্য কাঠের গাছ যেমন—মেহগনি, সেগুন, ইউক্যালিপটাস, শিশু, আকাশমণি, গর্জন, কাঁঠাল, চাপালিশ, কড়ই ইত্যাদি থেকে কাঠ পেতে যে সময় লাগে সেই একই সময়ে ‘পলোনিয়া’ গাছ থেকে ৩-৪ বার কাঠ পাওয়া যায়। এই কাঠের গুণগত মান এসব গাছের তুলনায় উত্তম। আর আর্থিক দিক থেকে চারগুণ বেশি লাভবান হওয়া যায়।

এই গাছ রোপণের ৮-১২ বছরের মধ্যে গাছের গোড়া থেকে নতুন একটি চারা গজায়। অর্থাৎ গাছটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার একটি সন্তান জন্ম দেয়। এ সময় মা গাছটিকে কেটে কাঠ সংগ্রহ করতে হয় এরপর নতুন গজানো চারাটি পুনরায় বাড়তে থাকে। এই প্রক্রিয়া শতাব্দীকালব্যাপী চলতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। তাই একবার গাছ লাগানোর পর আর চারা লাগানোর প্রয়োজন নেই। এর ফলে উত্পাদন ব্যয় কম হয়।

এই গাছ অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব। গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাতা থাকায় সুশীতল ছায়া দান করে। যার ফলে বাতাস থাকে শীতল আর প্রাকৃতিকভাবে দান করে অনেক পরিমাণে অক্সিজেন। গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে মাত্র ৪-৫ মাসের মধ্যেই ৭-৮ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন হয়। এর ফলে গরু-ছাগলের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে গাছ রক্ষার জন্য ঘেরা বা বেড়া দেয়ার প্রয়োজন হয় না।

গাছ শক্ত সামর্থ্য হওয়ায় ঝড়-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ গাছের রোগ-বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা অধিক।
এ গাছের মূল শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে, ফলে গাছের বয়স ১ বছর হলে পানি সেচের তেমন প্রয়োজন হয় না। ১০ বছর বয়সের গাছের মূল শিকড় ৪০ ফুট পর্যন্ত মাটির গভীর থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারে।

জলবায়ু ও মাটি : ক্রান্তীয় এবং নাতিশীতষ্ণ উভয় জলবায়ুতেই পলোনিয়া ভালো জন্মে। যে কোনো ধরনের মাটিতেই পলোনিয়া গাছ লাগানো যায়। তবে বেলে দো-আঁশ ও কাদা দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। পানি সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত উঁচু জমিই বিশেষভাবে উপযুক্ত। এই গাছের জন্য মাইনাস ১০ ডি. ফারেনহাইট থেকে ১১০ ডি. ফারেনহাইট পর্যন্ত তাপমাত্রা সহনীয়। মাটির পিএইচ মাত্রা ৫.০ থেকে ৮.৫ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য।
টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উত্পাদিত চারা রোপণের উপযোগী চারা ‘পলোনিয়া’ গাছের বাগান।

উত্পত্তি : Poulownia শব্দটি মূলত Pavlobnia থেকে এসেছে। রানী আন্না পাভলোভনা ছিলেন রাশিয়ার শাষণকর্তা Tsar Paul-ও এর কন্যা। রাশিয়ার এই রাজকুমারী এবং পরবর্তী সময়ে নেদারল্যান্ডের রানী Anna Pavlovna (১৭৯৫-১৮৬৫)-এর নামানুসারে রানীর সম্মানে এই বৃক্ষের নামকরণ করা হয়। রানীর নিকট এই বৃক্ষের ফুল খুবই প্রিয় ছিল। একই কারণে এ বৃক্ষের অপর নাম ‘princess tree’ কিংবা Royal tree. অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এই গাছকে অনেকে Super tree নামেও অভিহিত করে থাকে।

উত্পাদন : পলোনিয়া গাছের আদি জন্মস্থান চীন। চীনে বর্তমানে ১.২ বিলিয়ন পলোনিয়া বৃক্ষ রয়েছে। রাস্তার ধারে, বাগানে, অনাবাদি উঁচু জমিতে এসব গাছ রোপণ করা হয়েছে। চীন ছাড়া জাপান, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস প্রভৃতি পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পলোনিয়া বৃক্ষের চাষ করা হচ্ছে। সমগ্র পৃথিবীতে বর্তমানে ৬০ লাখ একর জমিতে পলোনিয়া গাছের বাগান রয়েছে। প্রতি বছর এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘পলোনিয়া’ গাছের বাগান বসন্তে ফোটে ফুল পাতাহীন গাছে ফুলের সমাহার গাছের লগ।

গাছ লাগানোর উপযুক্ত স্থান : বসতবাড়ির আশপাশের পতিত জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত, রাস্তার ধারে, গ্রামের হাট-বাজারে, অনাবাদি উঁচু জমিতে এবং উপকূলীয় এলাকায়।

কীভাবে গাছ লাগাবেন : প্রথমে চারা লাগানোর জন্য নির্বাচিত স্থানটি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। চারা রোপণের জন্য দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে এবং গভীরতায় দেড় ফুট আয়তনের গর্ত খনন করতে হবে। প্রতি গর্তে ১০ কেজি পচা আবর্জনা কিংবা পচা গোবরসহ ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমপি সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে ১০/১২ দিন রেখে দিতে হবে। পলিব্যাগ কিংবা ছোট টবে লাগানো ৬ ইঞ্চি থেকে এক ফুট আকারের চারা গোড়ার মাটিসহ সযত্নে নির্বাচিত গর্তে লাগাতে হবে। চারা রোপণের পর চারার গোড়ায় পানি দিতে হবে। চারা যাতে হেলে না যায় সেজন্য খুঁটির সঙ্গে সুতলি দিয়ে হাল্কাভাবে বেঁধে দিতে হবে।

ব্যবহার : যে কোনো ধরনের আসবাবপত্র প্রস্তুত, ঘরের সিলিং এবং পার্টিশন তৈরি, যানবাহন তৈরি, কাঠ খোদাইকরণ, প্যাকিং বাক্স তৈরি, বাদ্যযন্ত্র তৈরি এবং অন্যান্য শৌখিন সামগ্রী প্রস্তুতে এই গাছের কাঠ ব্যবহৃত হয়।
লেখক : মো. আলী আশরাফ খান, গ্রন্থাকার ও প্রধান নিরীক্ষা কর্মকর্তা, বিসিক, ঢাকা
এগ্রোবাংলা ডটকম