তেঁতুল ও শসার পাতা থেকে বালাইনাশক

তেঁতুল ও শসার পাতা থেকে বালাইনাশক

অন্যান্য সবজির জমির তুলনায় রহিমেরকান্দী গ্রামের সবজির জমিগুলোর চেহারা ভিন্ন। জমির সবজি গাছগুলো মোটা-তাজা, ফলনের আকার বড় ও দেখতে সুন্দর। বাজারেও এসব জমির সবজির চাহিদা ব্যাপক। ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ায় সবজি চাষিরাও খুশি। তবে সবজির ভালো ফলনের জন্য অন্য চাষিদের মতো জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করেন না এ গ্রামের চাষিরা। তারা যে কীটনাশক ব্যবহার করে, তা পরিবেশবান্ধব এবং মানব দেহের কোনো ক্ষতি করে না। তেঁতুলের পাতা ও শসার পাতা থেকে এ বালাইনাশক তৈরি করা হয়। ব্যতিক্রমী এ ভেষজ বালাইনাশক উদ্ভাবন করেছেন নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মখলেছুর রহমান। ইতিমধ্যে সবজির জন্য বিখ্যাত নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলার শাকসবজির জমিতে, ফলের বাগানে ও পানের জমিতে ব্যবহৃত হয়েছে এ ভেষজ বালাইনাশক। এ থেকে কৃষকরা বেশ উপকৃত হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ভেষজ বালাইনাশক। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও শসা ও তেঁতুল পাতার রসের পোকা দমন এবং রোগ প্রতিরোধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সন্তোষজনক ফল পেয়েছেন।

অনুপ্রেরণা ও উদ্ভাবন ফসলে বিশেষ করে সবজিতে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। এতে মানুষের স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। সম্প্রতি বিষযুক্ত সবজি খেয়ে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্যান্সারের প্রধান কারণ হচ্ছে বিষযুক্ত সবজি। এ কারণে দেশে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন শুরু হয়েছে। কিন্তু দেশে যেসব পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করা হয়, সেসব পদ্ধতিতে পোকার আক্রমণ ও রোগের প্রতিরোধ সম্ভব নয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে সব পোকা দমনও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বালাইনাশক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও জমিতে বিষ প্রয়োগ করতে হচ্ছে। তাই মখলেছুর রহমান প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে এমন একটি বালাইনাশক পদ্ধতি আবিষ্কারের বিষয়ে ভাবছেন, যাতে কৃষকদের জমিতে কোনো বিষ দিতে না হয়।

মখলেছুর রহমান জানান, এসব বিবেচনা করে বিষয়টি নিয়ে জেলার শিবপুরের কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সত্য রঞ্জন সাহার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করার, যার দ্বারা ক্ষতিকর পোকা ধ্বংস হবে কিন্তু উপকারী পোকার ক্ষতি হবে না। এরই অংশ হিসেবে তেঁতুল ও শসা পাতাসহ বিভিন্ন পাতার রস থেকে তৈরি ভেষজ বালাইনাশক পরীক্ষামূলকভাবে সবজির জমিতে ব্যবহার করা হয়। সব জমির প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, তেঁতুল ও শসার ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ বালাইনাশকে অপকারী পোকা মারা গেলেও উপকারী পোকার কোনো ক্ষতি হয়নি। বিভিন্ন সবজির জমিতে ব্যবহার করেও ভালো ফল পাওয়া যায়।

তৈরি হয় যেভাবে মুখ খোলা পাত্রে এক লিটার পানিতে ১২ গ্রাম শুকনো শসার পাতা সাত দিন ভিজিয়ে রাখতে হবে। সাত দিন পর এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে। এরপর সাত দিন ছিদ্রবিহীন রঙিন দুই-তিন পর্দা পলিথিন দিয়ে পাতিলের মুখ এমনভাবে বন্ধ করে রাখতে হবে, যেন বায়ুবদ্ধ অবস্থায় থাকে। এরপর ছেঁকে সরাসরি বালাই দমনে ব্যবহার করা যায় অথবা বোতলজাত করে রেখে ব্যবহার করা যাবে। এক লিটারের বেশি পানি হলে পরিমাণমতো শসার পাতা দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ভিজিয়ে সিদ্ধ করতে হবে। শসার পাতার বালাইনাশক প্রস্তুতের মতোই তেঁতুল পাতার বালাইনাশক প্রস্তুত করা হয়।

ব্যবহার স্প্রে মেশিনে প্রতি লিটার পানিতে আড়াই মিলিলিটার বালাইনাশক ভালোভাবে পানির সঙ্গে মিশিয়ে পুরো গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। পোকার আক্রমণ থাক বা না থাক পাঁচ দিন পর পর অবশ্যই স্প্রে করতে হবে। অবস্থাভেদে প্রতিদিন অথবা এক দিন পর পরও স্প্রে করা যায়। বেলা ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে স্প্রে করলে উপকার বেশি। তেঁতুলের পাতার ক্ষেত্রে প্রতি লিটার পানিতে চার থেকে পাঁচ মিলিলিটার বালাইনাশক তিন দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

মখলেছুর রহমানের সংগ্রাম অধিকাংশ কৃষক তৈরি কীটনাশক ব্যবহারে বেশি আগ্রহী। ভেষজ বালাইনাশক তৈরি করতে ১৭ দিন সময় লাগার কারণে অনেকে এ পদ্ধতি ব্যবহারে অনাগ্রহ দেখান। কিন্তু মখলেছুর রহমান থেমে যাননি, তিনি দিনের পর দিন জেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষকদের কাছে ছুটে গেছেন, বুঝিয়েছেন বালাইনাশক ব্যবহারের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং এর সুবিধা। পাশাপাশি কৃষকদের ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। ফলে কৃষকরা জমিতে ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহার করছেন এবং ভালো ফল পাওয়ায় তারা ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

মখলেছুর রহমান জানান, দীর্ঘ সংগ্রামের পর বর্তমানে বেলাব উপজেলার রহিমেরকান্দী গ্রামে ১০০ একর জমিতে কৃষকরা এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছেন। পাশাপাশি মনোহরদী উপজেলায় পানের বরজসহ বিভিন্ন উপজেলায় শাকসবজি, ফলের বাগানে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতি ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়ায় দিন দিন বাড়ছে বিষমুক্ত সবজি চাষির সংখ্যা।

কৃষকরা যা বলেন বেলাব উপজেলার রহিমেরকান্দী গ্রামের কৃষক সাহাব উদ্দিন জমিতে সারা বছরই বিভিন্ন সবজির চাষ করেন। জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে জমির ফসলের উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি বাজারে কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভের অধিকাংশই কীটনাশকের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে দুচিন্তায় পড়েন কৃষক সাহাব উদ্দিন। একদিন গ্রামে মখলেছুর রহমান সবজির জমি পরিদর্শক করতে আসেন এবং পরামর্শ দেন ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহার করার জন্য। মখলেছুর রহমানের কথামতো তিনি জমিতে ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহার করেন। ফলে জমিতে বেড়ে গেছে ফলনের পরিমাণ। পাশাপাশি বর্তমানে গ্রাম থেকে প্রতিদিন সকালে ট্রাকে বিষমুক্ত সবজি যাচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন মাল্টি সুপারমলে।

কৃষক সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘মখলেছ স্যারের কথামতো আমরা জমিতে তেঁতুল ও শসা পাতার রস ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজির মধ্যে সাফল্যের আলো খুঁজে পেয়েছি। জমিতে ফলন বাড়ার পাশাপাশি দাম পাচ্ছি সাধারণ সবজির চেয়ে বেশি। আমরা শুধু ঢাকায় নয়, বিদেশেও বিষমুক্ত সবজি বিক্রি করতে চাই।’
নরসিংদীর মনোহরদী পান চাষের জন্য বিখ্যাত। পানে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমরা সরাসরি বিষ খাচ্ছি। কিন্তু বর্তমানে মখলেছুর রহমানের পরামর্শে মনোহরদীর পান চাষিরা কীটনাশকের বদলে তেঁতুল পাতা ও শসা পাতার বালাইনাশক ব্যবহার শুরু করেছেন।
উপজেলার চরমান্দালিয়ার পান চাষি শহিদুল্লাহ ও আলাউদ্দিন বলেন, শসা পাতার রস ব্যবহারের ফলে এবার পাশের কীটনাশক ব্যবহার করা জমির চেয়ে আমাদের জমি থেকে ভালো পান উঠছে। গাছের আগাগোড়া হয়েছে মোটা, আকারে বড় হচ্ছে। পাশাপাশি শোষক পোকার আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের কথা নরসিংদীর শিবপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সত্য রঞ্জন সাহা বলেন, আমরা উপপরিচালক মখলেছুর রহমানের কথামতো বেগুনের চারটি পৃথক জমিতে সাধারণ, তেঁতুল পাতার রস, শসা পাতার রস ও কীটনাশক ব্যবহার করি। দেখা গেছে, সাধারণ জমিতে পোকামাকড়ের আক্রমণ সবচেয়ে বেশি, কীটনাশকের জমিতে কম এবং তেঁতুল পাতা ও শসা পাতার রস ব্যবহার করা জমিতে পোকার আক্রমণ কম ও ভালো ফলন পাওয়া যায়। এ পরীক্ষা থেকে সবজিতে তেঁতুল ও শসা পাতার রস কার্যকরী মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা ইনস্টিটিউট ঢাকার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জহুরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, শসার পাতার রসে সেফনিন ও তেঁতুলের পাতার রসে টেনিন যৌগ রয়েছে। এ দুটি যৌগই বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গবেষণাগারে শসা ও তেঁতুল পাতার রসের পোকা দমনের কার্যকারিতার ওপর লেটাল ড্রোস ৫০ ভাগ (খউ৫০) পরীক্ষা করে সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেছে।
লেখক: সুমন বর্মণ, নরসিংদী
এগ্রোবাংলা ডটকম