চা পাতা

চায়ের ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও দমন ব্যবস্থাপনা

চা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল ও রপ্তানী পন্য। চা গাছ একটি বহুবর্ষজীবি চিরসবুজ উদ্ভিদ। চা যেহেতু বহুবর্ষজীবি ও একক চাষকৃত উদ্ভিদ তাই চা গাছ পোকা, মাকড়ের জন্য স্থায়ী গৌন আবহাওয়া ও তাদের বৃদ্ধির জন্য খাদ্য সরবরাহের একটি অন্যতম উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করে। চা উৎপাদনের যেসব অন্তরায় রয়েছে তাদের মধ্যে চায়ের ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় ও কৃমিপোকা অন্যতম। বাংলদেশ চায়ে এখন পর্যন্ত ২৫ প্রজাতির পতঙ্গ, ৪ প্রজাতির মাকড় ও ১০ প্রজাতির কৃমিপোকা সনাক্ত করা হয়েছে। তন্মধ্যে আবাদী এলাকায় চায়ের মশা, উঁইপোকা ও লালমাকড় এবং নার্সারী ও অপরিনত চা আবাদীতে এফিড, জেসিড, থ্রিপস, ফ্লাসওয়ার্ম ও কৃমিপোকা মূখ্য ক্ষতিকারক কীট হিসাবে পরিচিত। অনিস্টকারী এসব পোকামাকড় বছরে গড়ে প্রায় ১৫% ক্ষতি করে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে ১০০% ক্ষতির সম্মুখীন হয়। নিম্নে চায়ের এসব ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের পরিচিতি ও তাদের সমন্বিত দমন ব্যবস্থা আলোচনা করা হলো।

১) চায়ের মশা (Tea mosquito bug): বাংলদেশ চায়ে চায়ের মশা একটি গুরুত্বপূর্ণ কীট। ইহা টি হেলোপেলটিস নামে পরিচিত। চায়ের এই শোষক পোকাটির নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ চায়ের কচি ডগা ও পাতার রস শোষণ করে এবং আক্রান্ত অংশ কালো হয়ে যায়। ব্যপক আক্রমনে নতুন কিশলয় গজানো বন্ধ হয়ে যায়।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. হেলোপেলটিস প্রতিরোধী জাত/ক্লোন ব্যবহার করে হবে। বিটি ১, বিটি ২, বিটি ৫, বিটি ৬, বিটি ১১ ও বিটি ১৩ জাতের ক্লোন হেলোপেলটিসের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল। বিটি ৮ জাতের ক্লোনটি তুলনামূলকভাবে কম সংবেদনশীল।
খ. হেলোপেলটিস আক্রান্ত সেকশনের ছায়াপ্রদানকারী গাছ সমূহের ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে যাতে সেকশনে পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে।
গ. বিকল্প পোষক সমূহ যেমনঃ মিকানিয়া, সিনকোনা, কোকোয়া, পেয়ারা, কাঁঠাল, আম, মিস্টি আলু, রঙ্গন ইত্যাদি গাছ অপসারন করতে হবে।
ঘ. সেকশন অবশ্যই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
ঙ. প্লাকিং রাউন্ড অবশ্যই ৭-৮ দিন অনুসরণ করতে হবে।
চ. শুষ্ক মৌসুমে হেক্টর প্রতি ২.২৫ লি. হারে ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ৫০০ লি. পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে স্প্রে অবশ্যই প্লাকিং এর পরের দিন করতে হবে।
ছ. বর্ষা মৌসুমে হেক্টর প্রতি ১.৫ লি. হারে থায়োডান ৩৫ ইসি অথবা ৫০০ মি.লি. হারে রিপকর্ড ১০ ইসি অথবা ৭৫০ মি.লি. হারে মেটাসিস্টক্স ২৫ইসি ৫০০ লি. পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

২) লাল মাকড় (Red spider mite): চায়ের লাল মাকড় খুবই অনিস্টকারী। আকারে অতি ক্ষুদ্র। পরিনত পাতার উপর ও নীচ থেকে আক্রমন করে থাকে। রস শোষনের ফলে পাতার উভয় দিক তাম্রবর্ন ধারন করে এবং শুষ্ক ও বিবর্ন দেখায়। উপোর্যপুরি আক্রমনে সম্পূর্ন পাতা ঝরে যায় ও কিশলয় ক্ষীণ বা লিকলিকে হয়।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. আক্রান্ত সেকশনের আশেপাশে বিকল্প পোষক হিসাবে গাঁদা ফুল গাছ লাগিয়ে আক্রমন কমানো যায়।
খ. সেকশন অবশ্যই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
গ. আক্রান্ত সেকশনে ছায়াপ্রদানকারী গাছ লাগাতে হবে।
ঘ. গবাদি পশুর বিচরন বন্ধ করতে হবে।
ঙ. রাস্তার পাশের বুশসমুহের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
চ. অ্যামোনিয়াম সালফেট, ফসফেট ও পটাশ সার মাকড় দমনে সহায়ক।
ছ. প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসাবে হেক্টর প্রতি ২.২৫ কেজি হারে সালফার ৮০ ডব্লিউ পি ১০০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫-৬ দিন অন্তর  স্প্রে করতে হবে।
জ. প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসাবে হেক্টর প্রতি ১.০০ লিটার হারে ইথিয়ন ৪৬.৫ ইসি অথবা ওমাইট ৫৭ ইসি ১০০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫-৬ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।
ঝ. লাল মাকড় আক্রান্ত সেকশনে সিনথেটিক পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক ব্যবহারে বিরত থাকুন কারন সিনথেটিক পাইরিথ্রয়েড লাল মাকড়ের প্রজনন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

৩) উঁইপোকা (Termites): উঁইপোকা মৌমাছির মত সামাজিক পতঙ্গ। চা বাগানে ’উলুপোকা’ নামে পরিচিত। ইহা চায়ের অন্যতম মূখ্য ক্ষতিকারক কীট। চা গাছের মরা-পঁচা বা জীবন্ত অংশ খায়। এরা মাটিতে ও গাছের গুড়িতে ঢিবি তৈরী করে বাস করে। কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণীই চা গাছ খেয়ে থাকে।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. উঁইপোকা প্রতিরোধী জাত/ক্লোন নির্বাচন করতে হবে। মনিপুরী বা মনিপুরী-চায়না হাইব্রিড জাত অথবা বিটি ৪, বিটি ৬, বিটি ৭ ও বিটি ৮ ক্লোন উঁইপোকা প্রতিরোধী জাত। বিটি ১০ ও বিটি ১১ ক্লোনদ্বয় উঁইপোকার প্রতি বেশ সংবেদনশীল।
খ. তিন বছরের প্র“নিং চক্র (লাইট প্রুনিং-ডীপ স্কীফ-লাইট স্কীফ) উঁইপোকার প্রার্দুভাব কমাতে সাহায্য করে।
গ. গুয়াতেমালা ও ক্যালোপোগুনিয়াম মাল্চ ম্যাটেরিয়াল হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।
ঘ. হেক্টর প্রতি ১.৫ লিটার হারে এডমায়ার ২০০ এসএল ১০০০ অথবা ১০ লিটার হারে ডার্সবান ২০ ইসি ১০০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় ভালভাবে স্প্রে করতে হবে।

৪) জেসিড (Jassid/Greenfly): নার্সারী ও অপরিনত চায়ের অন্যতম অনিষ্টকারী কীট। আবাদী এলাকায় ছাঁটাই উত্তর নতুন কিশলয়ে আক্রমন পরিলক্ষিত হয়। এরা চায়ের পাতার রস শুষে নেয়। আক্রান্ত পাতা নৌকাকৃতি ধারন করে ও কিনারা শুকিয়ে যায়।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. আক্রান্ত সেকশনে পর্যাপ্ত ছায়াপ্রদানকারী গাছ লাগাতে হবে।
খ. সেকশন অবশ্যই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
গ. প্লাকিং রাউন্ড অবশ্যই ৭-৮ দিন অনুসরণ করতে হবে।
ঘ. হেক্টর প্রতি ১.৫ লি. হারে থাযোডান ৩৫ ইসি অথবা ৫০০ মি.লি. হারে রিপকর্ড ১০ ইসি ৫০০ লি. পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে। কচি ডগা ও কচি পাতার নিচে স্প্রে করতে হবে।

৫) এফিড (Aphid): এদেরকে জাবপোকাও বলা হয়। নার্সারী ও অপরিনত চায়ের অন্যতম অনিষ্টকারী কীট। আবাদী এলাকায় ছাঁটাই উত্তর নতুন কিশলয়ে আক্রমন পরিলক্ষিত হয়। দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন বয়সের এফিড চায়ের কচি ডগা ও কচি পাতার রস শুষে নেয়। তাই বৃদ্ধি ব্যহত হয়। এদের অবস্থানের পাশাপাশি কালো পিপড়া দেখা যায়। ডিসেম্বর-মার্চ মাস পর্যন্ত আক্রমন তীব্র থাকে।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. নার্সারীতে হাত বাছাই উত্তম পদ্ধতি।
খ. আবাদীতে প্লাকিং রাউন্ড অবশ্যই ৭-৮ দিন অনুসরণ করতে হবে।
গ. বায়োকন্ট্রল এজেন্ট হিসেবে লেডি বার্ড বিটল ব্যবহার করেও এফিড কমানো যায়।
ঘ. হেক্টর প্রতি ১.৫ লি. হারে থাযোডান ৩৫ ইসি অথবা ৫০০ মি.লি. হারে রিপকর্ড ১০ ইসি ৫০০ লি. পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে। কচি ডগা ও কচি পাতার নিচে স্প্রেকরতে হবে।

৬) থ্রিপ্স (Thrips): থ্রিপ্স অতি ক্ষুদ্র বাদামী রংয়ের পোকা । নার্সারী ও অপরিনত চায়ের অন্যতম অনিষ্টকারী কীট। নার্সারী ও স্কিফ এলাকায় আক্রমন বেশী পরিলক্ষিত হয়। আবাদী এলাকায় ছাঁটাই উত্তর নতুন কিশলয়ে আক্রমন পরিলক্ষিত হয়। রস শোষণের ফলে পাতার উপরিভাগের মধ্যশিরার দু’পাশ্বে দুটি লম্বা শোষণ রেখা দেখা যায়।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. আক্রান্ত সেকশনে পর্যাপ্ত ছায়াপ্রদানকারী গাছ লাগাতে হবে।
খ. সেকশন অবশ্যই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
গ. বায়োকন্ট্রল এজেন্ট হিসেবে লেডি বার্ড বিটল ও মাকড়শা  ব্যবহার করেও থ্রিপ্স দমন করা যায়।
ঘ. আবাদীতে প্লাকিং রাউন্ড অবশ্যই ৭-৮ দিন অনুসরণ করতে হবে।
ঙ. হেক্টর প্রতি ১.৫ লি. হারে থাযোডান ৩৫ ইসি অথবা ৫০০ মি.লি. হারে রিপকর্ড ১০ ইসি ৫০০ লি. পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর ২ বার স্প্রেকরতে হবে। কচি ডগা ও কচি পাতার নিচে স্প্রে করতে হবে।

৭) ফ্লাশওয়ার্ম (Flushworm): এরা মথ জাতীয় পতঙ্গের অপরিনত দশা। দেখতে লেদা পোকার মত। দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়িকে গুটিয়ে পাটি-সাপটার মত মোড়ক তৈরী করে। মোড়কের ভিতরে থেকে কচি কিশলয় কুড়ে কুড়ে খায়। নার্সারী ও অপরিনত চাও আবাদী এলাকায় ছাঁটাই উত্তর নতুন কিশলয়ে এ সমস্যা ব্যপক।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. হাত বাছাই উত্তম পদ্ধতি। হাত বাছাই করে মোড়ক অংশটি বিনষ্ট করলে কীড়াটি মারা যাবে।
খ. দমনে কোন কীটনাশক ব্যবহার না করাই ভাল।

৮) উরচুঙ্গা (Cricket): নার্সারী ও অপরিনত চা আবাদীতে উরচুঙ্গা বড় সমস্যা। মুখে শক্ত ও ধারালো দাঁত আছে। সামনের পা জোড়া খাঁজকাটা, চ্যাপ্টা কোদালের মত। পায়ের এ অবস্থার কারনে ছোট চা-চারাকে ধরে সহজেই কেটে ফেলে। এরা নিশাচর পতঙ্গ। মাটিতে গর্ত করে থাকে এবং সন্ধার পর বের হয়ে আসে।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. ইহা দমনে নার্সারী ও অপরিনত চা আবাদী এলাকার উরচুঙ্গার গর্তগুলো সনাক্ত করে গর্তের মুখে দু’ চা চামচ পোড়া মবিল দিয়ে চিকন নলে পানি ঢেলে দিতে হবে। উরচুঙ্গা গর্ত থেকে বের হয়ে আসলে লাঠি বা পায়ের আঘাতে মেরে ফেলতে হবে।

৯) লিফ রোলার (Leaf roller): এরাও মথ জাতীয় পতঙ্গের অপরিনত দশা। এরা পাতার অগ্রভাগ থেকে নিম্নভাগের দিকে পাতা মুড়িয়ে ফেলে এবং মোড়কের ভিতরে থেকে কচি কিশলয় কুড়ে কুড়ে খায়। এরা সাধারনত ২য় থেকে ৪র্থ পাতায় আক্রমন করে থাকে।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. হাত বাছাই উত্তম পদ্ধতি। হাত বাছাই করে মোড়ক অংশটি বিনষ্ট করলে কীড়াটি মারা যাবে।
খ. দমনে কোন কীটনাশক ব্যবহার না করাই ভাল।
১০) কৃমিপোকা (Nematode/Eelworm)
কৃমিপোকা নার্সারীর প্রধানতম পেষ্ট। এরা মাটিতে বাস করে। অতিক্ষুদ্র ও আণুবীক্ষণিক পোকা। দেখতে সূতা বা সেমাই আকৃতির। কচি শিকড়ের রস শোষণ করে। ফলে শিকড়ে গিট তৈরি হয়। আক্রমনে চারা দুর্বল ও রুগ্ন হয়। পাতা হলুদ ও বিবর্ণ দেখায়। চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

সমস্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ ক. ৬০-৬৫º সে. তাপমাত্রায় নার্সারির মাটি তাপ দিয়ে এ পোকা দমন করা যায়।
খ. গাছ প্রতি ২৫০ গ্রাম হারে নিম কেক প্রয়োগ করেও ভাল পাওয়া যায়।
গ. এছাড়া প্রতি ১ ঘনমিটার মাটিতে ফুরাডান ৫ জি ১৬৫ গ্রাম হারে অথবা কারবোফুরান ৩ জি ২৭৫ গ্রাম হারে প্রয়োগ করে কৃমিপোকা দমন করা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ মোহাম্মদ শামীম আল মামুন
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।
এগ্রোবাংলা ডটকম