agrobangla

গলদা চিংড়ি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য সম্পদ। দেশের প্রায় সকল এলাকার স্বাদুপানির জলাশয় গলদা চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা আছে বিধায় গলদা চিংড়ি চাষ যথেষ্ট লাভজনক। দেশের অপেক্ষাকৃত নিচু ধানের জমিতে ঘের পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষ করা যেতে পারে। ঘের হলো অপেক্ষাকৃত নিচু ধানের জমি যার চারপাশে উঁচু জমি থাকে অথবা মাটির শক্ত বাঁধ থাকে। বর্ষাকালে ঘের পানিতে ভরে যায় বলে এই মৌসুমে ধান চাষ করা সম্ভব হয় না। ঘেরে এপ্রিল-মে বা বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে ধান কাটার পর গলদা চিংড়ির চাষ করা হয় অর্থাৎ ঘেরে প্রথমে ধান চাষের পর সেখানে চিংড়ি চাষ করা হয়। আবার চিংড়ি আহরণ করার পর সেখানে ধান চাষ করা হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘের পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনেক নিচু জমি রয়েছে যেখানে শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষ হয় কিন্তু বর্ষাকালে সেগুলো পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এসব জমিতে চিংড়ির চাষ করে যথেষ্ট লাভবান হওয়া যায়।

ঘেরের বৈশিষ্ট্য
একটি ঘেরের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য থাকলে তা গলদা চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা যায়ঃ
* গলদা চিংড়ি চাষের জন্য নির্বাচিত ঘেরে ৪-৬ মাস ৩.০-৪.০ ফুট উচ্চতার পানি ধরে রাখার সুবিধা থাকতে হবে।
* ঘেরের মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি থাকতে হবে যাতে ঘের তাড়াতাড়ি শুকিয়ে না যায়।
* সাধারণত দোআঁশ বা বেলে-দোআশ মাটির ঘের গলদা চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত।
* ঘের একটু নিচু জায়গায় হলে পানি ধরে রাখতে সুবিধা হয়।
* ঘেরে বন্যার পানি যেন প্রবেশ না করতে পারে এবং বন্যা বা বৃষ্টির পানিতে বাঁধ যেন প্লাবিত না হয়। নিচু ঘেরের বাঁধ উঁচু করে বেঁধে বন্যামুক্ত করে চিংড়ি চাষের উপযুক্ত করা যায়।
* ঘেরের আকার ৩০-১০০ শতাংশ হলে ব্যবস্থাপনার জন্য সুবিধা হয়।
* ঘেরে যথেষ্ট সূর্যালোক পড়তে হবে।
* ঘেরে উৎপাদিত চিংড়ি বাজারজাত করার সুবিধা থাকতে হবে।

মজুদপূর্ব ব্যবস্থাপনা

ঘের প্রস্তুতকরণ
ঘেরে চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে ঘের প্রস্তুতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘের যত ভালভাবে প্রস্তুত করা হবে চিংড়ির উৎপাদন তত বেশি হবে। এজন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বাঁধ নির্মাণ
* ঘেরের চারপাশে বাঁধ বা উঁচু জমি না থাকলে সেখানে বাঁধ নির্মাণ করে নিতে হবে। যে সব ঘেরের বাঁধ বা চারপাশের জমি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয় না তেমন ঘের নির্বাচন করতে হবে।
* বাঁধ ভাঙ্গা থাকলে তা মেরামত করতে হবে।
* বাঁধ যথেষ্ট শক্ত হতে হবে যাতে পানির চাপে ভেঙ্গে না যায় এবং চিংড়ি বের হয়ে যেতে না পারে।
* বাঁধ যথেষ্ট উঁচু হওয়া উচিত যাতে বন্যার পানি সেখানে প্রবেশ না করতে পারে।
* বাঁধ যথেষ্ট প্রশস্ত করে তাতে শাকসবজির চাষ করা যেতে পারে।

নালা খনন
* চিংড়ির চলাচল এবং অবস্থানের সুবিধার্থে ঘেরে নালা খনন করতে হবে।
* নালা খননের ফলে এতে সবসময় পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়।
* অত্যধিক গরমের সময় চিংড়ি নালায় এসে আশ্রয় নিতে পারে।
* ঘেরে যখন ধান চাষ হয় তখন নালা নার্সারী হিসাবে ব্যবহার করা যায়।
ঘেরের মাটি এবং জমির উপরিপৃষ্ঠের ধরনের উপর ভিত্তি করে ঘেরের চতুর্দিকে, মাঝখানে অথবা যে কোনো এক বা দুই পাশে নালা খনন করা যায়। বাঁধের ভিতরে জমির সমতা বা ঢাল অনুসারে নালা খনন করতে হবে। নালার দৈর্ঘ্য হবে ঘেরের আয়তনের অনুপাতে। নালার প্রস্থ কমপক্ষে ৪-৬ ফুট এবং সমতল এলাকা থেকে গভীরতা ১.৫-২.০ ফুট হলে ভাল।

পানি নির্গমন পথ তৈরি
বর্ষাকাল বা অন্য যে কোনো কারণে যদি ঘের পানিতে পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার জন্য বাঁধে পানি নির্গমন পথ তৈরি করতে হবে। চিংড়ি যাতে বের হয়ে যেতে না পারে সে জন্য নির্গমন পথের মুখে জাল বা বাঁশের বানা স্থাপন করতে হবে।

নালা শুকানো, কাদা অপসারণ ও চাষ দেওয়া
নালা থেকে পানি নিষ্কাশন করে কাদা অপসারণের পর তা রৌদ্রে শুকাতে হবে । নালা ও জমিতে চাষ দিতে হবে এবং ধানের গোড়া অপসারণ করতে হবে।

চুন ও সার প্রয়োগ
নালা ও সমস্ত জমিতে ১ কেজি/শতাংশ হিসাবে চুন প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে এবং নালার জৈব সার (প্রতি শতাংশে ৫-৬ কেজি গোবর, অথবা ৮-১০ কেজি কম্পোষ্ট অথবা ৩-৫ কেজি হাঁস-মুরগীর বিষ্ঠা) প্রয়োগ করতে হবে এবং তা মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। পানি প্রবেশ করানোর পর অজৈব সার (প্রতি শতাংশে ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি) প্রয়োগ করতে হবে।

পানি প্রবেশ করানো
ধানকাটার পর ঘের সাধারণত আস্তে আস্তে বৃষ্টির পানিতে পূর্ণ হয়ে যায়। তবে নালা শুকনোর পর তাতে জুভেনাইল (চিংড়ি পোনা) মজুদ করতে চাইলে অন্যান্য উৎস, যেমন-ডিপ টিউবয়েল, আশপাশের নদী,খাল, দীঘি ইত্যাদি থেকে পানি সরবরাহ করতে হবে।

আগাছা অপসারণ
ঘেরের বাঁধে সূর্যালোককে বাধাদানকারী গাছপালা থাকলে তা অপসারণ বা ডালপালা কেটে ফেলতে হবে। নালা যদি শুকনো সম্ভব না হয় তবে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে জলজ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।

রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত প্রাণী দূরীকরণ
নালা যদি শুকানো সম্ভব না হয় তবে রোটেনন বা অন্য কোন বিষ প্রয়োগ করে রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত জলজ প্রাণী দূর করতে হবে।

আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা করা
ঘের পানিতে পূর্ণ হলে তাল, নারিকেল ও খেজুরের পাতা, বাঁশের কঞ্চিসহ আগালি, প্লাস্টিকের ভাঙ্গা পাইপ ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করে জুভেনাইলের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

জুভেনাইল মজুদ
গলদা চিংড়ির পোনাকে পিএল (post larvae) বলা হয় এবং অপেক্ষাকৃত বড় পোনাকে জুভেনাইল বলা হয়। ঘেরে গলদা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে জুভেনাইল-এর আকার একটু বড় হতে হবে এবং তা কমপক্ষে ৫.০ সে.মি. আকারের হলে ভাল হয়। নার্সারী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পিএল থেকে জুভেনাইল তৈরি করে তা ঘেরে ছাড়তে হবে। ঘেরের নালা বা নালার একটি অংশ অথবা আলাদা ছোট পুকুর নার্সারী হিসাবে ব্যবহার করা যায়। ঘেরে জুভেনাইল মজুদ হার নির্ভর করে চাষ পদ্ধতি, চাষের সময়কাল, জুভেনাইলের প্রাপ্যতা, মাটি ও পানির গুণাগুণ, ব্যবস্থাপনা কলাকৌশল ইত্যাদির উপর। যদি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক খাদ্যের উপর নির্ভর করা হয় তবে মজুদ ঘনত্ব কম হবে, তৈরি খাদ্য সরবরাহ করলে মজুদ ঘনত্ব বেশি হবে, পাশাপাশি পানি পরিবর্তন ও বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা থাকলে মজুদ ঘনত্ব আরও বেশি হবে। তৈরি খাদ্য সরবরাহ করলে প্রতি শতাংশে ৪০-৬০টি জুভেনাইল ছাড়তে হবে। অতিরিক্ত প্লাংকটন নিয়ন্ত্রণের জন্য শতাংশ প্রতি ২-৪টি সিলভার কার্প এবং কাতলার পোনা ছাড়তে হবে। জুভেনাইল ছাড়ার আগে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। মে-জুলাই মাসে জুভেনাইল ছাড়তে হয়। এ সময় জমিতে ২-৩ ফুট পানি থাকলে ভাল হয়। জমিতে পানি না থাকলে ঘেরের নালায় জুভেনাইল ছাড়তে হবে।
অনেক সময় ঘেরের নালা বা নালার অংশ নার্সারী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। নালায় পিএল লালন করার পর বৃষ্টিতে যখন নালা পরিপূর্ণ হয়ে পানি সারা ঘেরে ছড়িয়ে পড়ে তখন জুভেনাইলও সারা ঘেরে ছড়িয়ে পরে। এক্ষেত্রে কী পরিমাণ জুভেনাইল মজুদ করা হলো তা জানা সম্ভবপর হয় না। কিন্তু উন্নত পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে ঘেরে কী পরিমাণ জুভেনাইল ছাড়া হলো তা অবশ্যই জানা দরকার। তাই নালাতে উৎপাদিত জুভেনাইল অবশ্যই গণনা করে সারা ঘেরে ছাড়তে হবে।

মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা

প্রাকৃতিক খাদ্য
চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের জন্যে গলদা চিংড়ি চাষকালীন সময়ে পুকুরে ১৫ দিন পর পর ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০০ গ্রাম টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে। অথবা ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৪ কেজি গোবর প্রয়োগ করতে হবে। তবে সার প্রয়োগের মাত্রা পুকুরে প্রাকৃতিক খাবারের উপস্থিতির উপর নির্ভর করবে।

সম্পুরক খাদ্য
ঘেরে নিয়মিত সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। নিচের সূত্র অনুযায়ী নিজেরা খাদ্য তৈরি অথবা বাণিজ্যিকভাবে খাদ্য ক্রয় করা যেতে পারে।

সারণী ১. গলদা চিংড়ির জন্য খাদ্য তৈরির সূত্র


চিংড়ির বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা
চিংড়ি ঘেরে ছাড়ার পর থেকে গলদা চিংড়ির বৃদ্ধির হার প্রথমে বেশি থাকে এবং পরবর্তীতে কমতে থাকে। চিংড়ি বেঁচে থাকার হার, দৈহিক বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, রোগ-বালাই ইত্যাদি পর্যবেক্ষণের জন্য নালা থেকে ঝাঁকি জাল দ্বারা ৫-৭ বার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে হবে। সকালে বা বিকালে এ কাজটি করতে হবে। রোগলক্ষণ পরিলক্ষিত হলে সাথে সাথেই প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘের নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে এবং কোনো অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পানির গুণাগুণ অনুকূল মাত্রায় রাখতে হবে। অতি বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে ঘেরের পানি দ্রুত বেড়ে গেলে নির্গমন নালার মাধ্যমে পানি বের করে নিতে হবে।

চিংড়ি আহরণ ও উৎপাদন
অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে ঘেরের পানি কমে গেলে চিংড়ি আহরণ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষে একর প্রতি ২০০-২৫০ কেজি উৎপাদন হয়ে থাকে।
বড় গ্রেডের প্রতি কেজি চিংড়ির মূল্য অপেক্ষাকৃত ছোট চিংড়ির তুলনায় অনেক বেশি বিধায় আহরণের পর কিছু চিংড়ি পুনরায় নালায় মজুদ করা হয় যাতে পরবর্তী মৌসুমে বৃদ্ধি পেয়ে বড় গ্রেডের চিংড়িতে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকলে অধিকাংশ চিংড়ি মারা যেতে পারে। চাষের শুরুতে আগের বৎসরের ওভার উইন্টার (বাড়তি মজুদের পোনা) করা জুভেনাইল মজুদ করলে এক মৌসুমেই বড় গ্রেডের চিংড়ি পাওয়া সম্ভব।
একটি ঘেরে গলদা চিংড়ি চাষের আয়-ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব নিচে দেখানো হলো।

সারণী ২. এক একরের একটি ঘেরে গলদা চিংড়ি চাষের আয়-ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব-


উপসংহারঃ
স্বাদুপানির চিংড়ির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রজাতি হলো গলদা চিংড়ি। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পানি গলদা চিংড়ি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। গলদা চিংড়ি বাগদা চিংড়ির চেয়ে কম রোগাক্রান্ত হয়। সারাদেশের অসংখ্য পুকুর জলাশয়ের পাশাপাশি নিচু ধানক্ষেতে ধানের সাথে বা ঘের পদ্ধতিতে ধান কাটার পরে গলদা চিংড়ির চাষ করলে চিংড়ি উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
লেখক: ড. মোঃ আমজাদ হোসেন
সহযোগী অধ্যাপক, ফিসারিজ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
এগ্রোবাংলা ডটকম