agrobangla

মাশরুম চাষে ভাগ্য উন্নয়নের সম্ভাবনা

জীবন ধারণের জন্য প্রত্যেকটি মানুষই কর্ম খুঁজে এবং সেই কাজের মাধ্যমেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেই চাওয়া-পাওয়ার আচ্ছাদনে বিচার বিবেচনায় সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট কাজগুলোই সবাইকে আকর্ষণ করে। মাশরুম চাষের মাধ্যমে যে কেউ আত্দনির্ভরশীল হতে পারে।

মাশরুম পরিচিতি: মাশরুম এক প্রকার ছত্রাক। এটা একটি সুস্বাদু খাবার। বর্তমানে বাংলাদেশেও মাশরুম খাবার হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে; কিন্তু সবধরনের মাশরুম খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। পৃথিবীতে প্রায় ৩ লাখ প্রজাতির মাশরুম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার প্রজাতি খাওয়ার অযোগ্য। আনুমানিক ১০ হাজার প্রজাতির মাশরুমের ওপর গবেষণা চলছে। এদের ভেতরে মাত্র ১০ প্রজাতির মাশরুম খাবার হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে ঋষি মাশরুম, গুটি বা বাটন মাশরুম, মিল্ক হোয়াইট মাশরুম, ওয়েস্টার মাশরুম, স্ট্র মাশরুমের চাষ করা হচ্ছে। অধিক পরিমাণ লাভজনক হওয়ায় অনেক লোক মাশরুম চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। মাশরুম চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা। ক্ষুদ্র বা ব্যাপক পরিসরে মাশরুম চাষ করা যায়। স্পূন থেকে মাশরুম চাষ করা হয়। এই স্পূনগুলো ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়।

মাশরুম চাষ পদ্ধতি: মাশরুম চাষ করতে গেলে সর্বপ্রথম সঠিক কর্মপরিকল্পনা করা প্রয়োজন। সঠিকভাবে কাজ পরিচালনা করার জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। কিছু লোক একত্রে মিলেমিশে মাশরুম চাষ করলে দ্রুত লাভবান হওয়া সম্ভব। ঘরে বসে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করা যায়। গ্রাম বা শহরের বেকার যুবকরা এই মাশরুম চাষ করে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেন। পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও ঘরে বসে অল্প মূলধনে মাশরুম চাষ শুরু করতে পারেন। মাশরুম চাষ করার জন্য আলোহীন স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ প্রয়োজন, তবে খেয়াল রাখতে হবে ঘরে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে, শহর ও গ্রামে সব জায়গায় মাশরুম চাষ করা সম্ভব। স্পূনগুলোকে রাখার জন্য ছোট ছোট মাচা ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো হতে পারে লোহা, বাঁশ কিংবা কাঠের। অতিরিক্ত গরম মাশরুম চাষের জন্য প্রতিকূল; এজন্য প্রয়োজন হলে ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি মাশরুম চাষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি প্রয়োজন। হ্যান্ড স্প্রে মেশিনের সাহায্যে স্পূনগুলোতে নিয়মিত পানি দিয়ে স্যাঁতসেঁতে করে রাখতে হবে।

এভাবে আসা যাক উৎপাদন সম্পর্কে সাধারণত ভালো মানের স্পূন থেকে গ্রীষ্মকালে প্রতি আড়াই মাসে ৯০ থেকে ১০০ গ্রাম মাশরুম পাওয়া সম্ভব। শীত ও বর্ষাকালে মাশরুম উৎপাদন অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে এ সময় একটি ভালো মানের স্পূন থেকে প্রতি আড়াই মাসে ২০০-২৫০ গ্রাম মাশরুম উৎপাদন করা যায়। ১০-১২ টাকা মূল্যের এই স্পূনগুলো প্রতি আড়াই মাস পর পর পরিবর্তন করতে হয়। বাংলাদেশের অনেক এলাকায়ই বর্তমানে মাশরুম চাষ করা হয়। এগুলোর মধ্যে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহীসহ সারাদেশেই বর্তমানে মাশরুম চাষ করা হচ্ছে। ঢাকা শহরে বিভিন্ন এলাকায় যেমন গোড়ান, কোর্ট কাচারি এলাকা, রামপুরা, বনশ্রী, সাভার, টঙ্গীতে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ করছে।

মাশরুম বিপণন পদ্ধতি: মাশরুম চাষের পাশাপাশি মাশরুম বিপণন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে বিপণন করতে না পারলে মাশরুম থেকে অধিক পরিমাণ লাভ করা সম্ভব নয়। এজন্য চাষের পাশাপাশি বিপণন বা মার্কেটিং পদ্ধতিটিও ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। মাশরুম কোথায় কোথায় বিক্রি করা যায়। কোথায় বিক্রি করলে লাভ বেশি এগুলো জানা প্রয়োজন। সাধারণত বিভিন্ন হোটেলে মাশরুম বিক্রি করা যায়। এছাড়া বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর যেমন_ আগোরা, নন্দন, মিনা বাজার ইত্যাদি জায়গায় ভালো ও অধিক পরিমাণে মাশরুম সরবরাহ করতে পারলে বিক্রির সুযোগ আছে। খোলাবাজারে নিজ উদ্যোগেও মাশরুম বিক্রি করা সম্ভব। সাধারণত বাজারে প্রতিকেজি মাশরুম ১৫০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে থাকে। যদি কোনো কারণে কখনো মাশরুম বিক্রি করা না যায়, সেক্ষেত্রে মাশরুম শুকিয়ে রাখা সম্ভব। এটাকে ড্রাই মাশরুম বলে। বাজারে ড্রাই মাশরুমের দাম কেজিপ্রতি ১,০০০-১,২০০ টাকা। ড্রাই মাশরুম পানিতে ভিজালে আবার কাঁচা মাশরুমের মতো হয়ে যায়। বিক্রির অসুবিধা হলে মাশরুম সংরক্ষণ করা সম্ভব বলেই এটা একটি লাভজনক ব্যবসা। কোনো সুখ্যাত প্রতিষ্ঠানে মাশরুম সরবরাহ করতে হলে দুটি বিষয় ভালো করে মনে রাখতে হবে। একটি দ্রব্যের মান ও অপরটি দ্রব্যের উৎপাদনের পরিমাণ। যখন ভালো মানের মাশরুমের চাহিদা তৈরি হবে তখন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তা অধিক পরিমাণে আশা করবে। একজন ক্ষুদ্র মাশরুম চাষির পক্ষে যা পূরণ করা কষ্টকর। এ জন্যই কিছুসংখ্যক লোক মিলেমিশে চাষাবাদ করতে পারলে অধিক পরিমাণ মাশরুম সরবরাহ করা সম্ভব।

মাশরুম চাষ ও প্রশিক্ষণ স্থান: মাশরুম চাষ ও প্রশিক্ষণের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সাভারে কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তর 'মাশরুম চাষ সেন্টার' নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এখানে প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণার্থীকে আগে থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মেয়াদ তিন দিন পর্যন্ত। এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের সরকারিভাবে সার্টিফিকেট প্রদানের মাধ্যমে কিভাবে মাশরুম চাষ করা যায়, কিভাবে বিপণন করা যায়, মাশরুম চাষের সমস্যা সুবিধা ইত্যাদি বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা প্রদান করে থাকে। সরকারিভাবে এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা অধিক সময় না হওয়ায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও মাশরুম চাষের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে ঢাকার মৌচাকে মুকুল টাওয়ারে 'হিউম্যান ওয়েলফেয়ার এন্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, সাভার বাসস্ট্যান্ডে পুরাতন কাস্টমস অফিসের পাশে 'শেফা মাশরুম' ইত্যাদি অন্যতম। মাশরুমের চাষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে 'হিরার' চেয়ারম্যান ব্রজেন বিশ্বাস বলেন, মাশরুম অত্যন্ত সুস্বাদু ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে; কিন্তু সরকারিভাবে সবসময় প্রশিক্ষণ না হওয়ায় 'হিরা' নিজস্ব উদ্যোগে মাশরুম চাষ ও গবেষণা শুরু করেছে। বর্তমানে 'হিরা' থেকে মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণও চালু হয়েছে। এ ব্যাপারে 'হিরার' চেয়ারম্যান ব্রজেন বিশ্বাস আরো বলেন, ২০০৬ সাল থেকে তারা মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। প্রতিবছর এখান থেকে ২০০-২৫০ লোক, মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। বছরের যেকোনো সময়ই এখানে মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। প্রতি ব্যাচে ৫-২০ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। চারদিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে প্রশিক্ষণার্থীকে জনপ্রতি ১ হাজার ৫০ টাকা করে প্রদান করতে হয়।

সম্ভাবনা: মাশরুম চাষ আমাদের দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় দিক। সরকার সঠিকভাবে মাশরুম চাষের দিকে নজর দিলে মাশরুম চাষ একটি অন্যতম সাফল্যমণ্ডিত ক্ষেত্রে পরিণত হবে। এখান থেকে হাজার হাজার বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মাশরুম চাষের দিকে নজর দিলে সম্ভাবনাময় মাশরুম চাষ আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে এটাই সবার প্রত্যাশা এবং এই প্রত্যাশার প্রাপ্তি যেন ঘটে।
লেখক: বকুল হাসান খান
এগ্রোবাংলা ডটকম

মাশরুম চাষ ও এ সংক্রান্ত বিষয়ে যাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন

মাশরুম চাষ প্রশিক্ষন, বীজ ও লোনসহ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য
গ্রীন বাংলা মাশরুম কর্নার
মাশরুম লাভলু
বি-১৯, বিটিআরসি মার্কেট, বগুড়া
মোবাইল: ০১৭১৬-৮৮৪৩৬৮

বীজ, তাজা, শুকনা ও পাউডার মাশরুম পাইকারী ক্রয়-বিক্রয় এবং প্রশিক্ষন
খাদেম মাশরুম সেন্টার
শফিউল আজম খান
মোবাইল: ০১৯১৬-৮২০৪৫৮, ০১৭১৫-৪৭৫০১২
৫৮১/সি, খিলগাঁও, ঢাকা-১২২৯

মাশরুম উৎপাদন এবং ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র
সৈকত মাশরুম প্রকল্প
মো: সোহরাব আলী
মোবাইল: ০১৭১৬-৪০৮৮৮০
১০৪/১ কাতলাপুর, সাভার, ঢাকা

মাশরুম স্পন ও পাইকারী ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র
এম. আর. টি মাশরুম প্রজেক্ট
রতন ইসলাম
মোবাইল: ০১৭১৫-৮৭৩৭৮০
মডেল কলেজ রোড, ডগড়মোড়া, সাভার, ঢাকা

তাজা, শুকনা এবং মাশরুম স্পন (বীজ) বিক্রয় কেন্দ্র
সুখী মাশরুম
আবদুল হালিম
মোবাইল: ০১৯১২-৪১১৭৫৫
১৯/৯, আই ব্লক, ব্যাংক কলোনী, সাভার, ঢাকা

মাশরুম বীজ, মাশরুমের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম (অটোক্লেভ মেশিন, পিপি, নেক, তুলা, রাবার) বিক্রয় কেন্দ্র
উদ্যম মাশরুম কর্নার
মো: সাইফুল ইসলাম (জামান)
মোবাইল: ০১৮১৬-৪৩০২৬৬, ০১৭১৬-৫০৩৮৩০, ০১১৯৯-১৬১২৯১
বি-১১১, সোবাহানবাগ, সাভার, ঢাকা
এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে হলে ফোন করা যেতে পারে। মোবাইল নং-০১৭১০৪০৭০৭৪, ০১১৯৯৪২৫৫২৩, ০১৯১১৪০৫৩৬৬
এগ্রোবাংলা ডটকম