agrobangla

তেলাপিয়া একটি দ্রুত বর্ধনশীল মাছ এবং এই মাছ খুব সহজেই প্রজনন করে থাকে। বাংলাদেশে ৭০ এর দশকে তেলাপিয়া আমদানী হলেও এর চাষের ব্যাপকতা পায় ২০০০ সালের কিছু আগে থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত।তেলাপিয়ার আদিনিবাস আফ্রিকায় হলেও বর্তমানে সারা দুনিয়ায় এর বিস্তার ঘটেছে।আগেই উল্লেখ করেছি তেলাপিয়া সহজেই প্রজনন করে থাকে।তেলাপিয়া একটি দ্রুত বর্ধনশীল মাছ হলেও এরা ৫ মাস বয়সেই পূর্নতা পেয়ে বাচ্চা দিয়ে থাকে।এ কারনে অতিরিক্ত বাচ্চা হওয়ার ফলে এর চাষ ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার কারনে পরে আর তেমন বড় হয়না।এটা তেলাপিয়া চাষের ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায়।যে কারনে সারা দুনিয়ায় হরমোনের মাধ্যমে এক লিঙ্গ মাছ বা পুরুষ মাছের রুপান্তর চলছে। একটি নিদ্রিষ্ট মাত্রায় একটি নিদ্রিষ্ট হরমোন নিদ্রিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়ানোর ফলে ১০০% না হলেও ৯৮ % পর্যন্ত পুরুষ তেলাপিয়া করা সম্ভব। তেলাপিয়ার স্ত্রী মাছের চেয়ে পুরুষ মাছে বেশী বাড়ে বলে পুরুষে রুপান্তর করার উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য এই প্রক্রিয়াটি এতদিন শুধু মাত্র হ্যাচারীতেই সম্ভব ছিল। এখানে হ্যাচারী ব্যাতীত কিভাবে পুকুরে তেলাপিয়ার এক লিঙ্গ অর্থাৎ পুরুষ তেলাপিয়া উৎপাদন করা যায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হল ।এ পদ্ধতি অনুসরন করে যে কোন খামারী হ্যাচারী না করেই পুকুরে তেলাপিয়ার মনোসেক্স পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন। এটা একটা নিবিড় পর্যবেক্ষন বা নিবিড় গবেষনার ফল।কোন হ্যাচারীর মালিক হয়ত এটা সমর্থন করবেন না। কিন্তু এ লেখায় আমার অভিজ্ঞতার বা গবেষনার ফল মৎস্য খামারীর কাছে তুলে ধরার প্রয়াস চালাচ্ছি।এতে সাধারন মৎস্য খামারীরা নিশ্চিভাবেই উপকৃত হবেন। তেলাপিয়ার মনোসেক্স বা পুরুষ তেলাপিয়ার উৎপাদনকে তিন ভাগে উৎপাদন করা যায়।

১.প্রাকৃতিক পদ্ধতি
২.হরমোন পদ্ধতি এবং
৩.সুপার পুরুষ পদ্ধতি।
সুপার পুরুষ পদ্ধতি আমাদের দেশে তেমন একটা প্রচলন ঘটেনি।সবে মাত্র এটা নিয়ে কাজ চলছে।প্রথম ২ টি পদ্ধতি নিয়ে এখানে আলোচনা করা হল।

১. প্রাকৃতিক পদ্ধতি- প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মনোসেক্স পোনা উৎপাদন করতে হলে প্রথমে অন্তঃপ্রজনন মুক্ত তেলাপিয়ার ব্র“ড মাছ একটি পুকুরে লালন পালন করতে হবে যাকে আমরা ব্র“ড মাছের পুকুর বলে থাকি।প্রথমে পুকুর ভালভাবে শুকিয়ে শতাংশ প্রতি ১ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হবে।তারপর গভীর বা অগভীর নলকুপ দিয়ে পুকুরে ৩ ফুট পানি দিয়ে ভরতে হবে।তারপর শতাংশ প্রতি ২০ টি স্ত্রী এবং এর সাথে ৮ টি পুরুষ মাছ ছাড়তে হবে। খাবার হিসাবে যে কোন ভাসমান খাবার শরীরের ওজনের ৩/৪% হারে খাবার প্রয়োগ করতে হবে।এ অবস্থায় পুকুরে বাচ্চা দেয়া শুরূ করবে। এ পদ্ধতিতে পুকুর থেকে বাচ্চা সংগ্রহের পর নার্সারী পুকুরে বড় করা হয়। নীচে নার্সারী পুকুর ও বাচ্চা লালন পালনের কৌশল বর্ণিত হল।

নার্সারী পুকুর প্রস্তুত প্রনালী ও পুরুষ মাছ নির্বাচন- নার্সারী পুকুরের আয়তন ৩০/৪০ শতাংশের হলে ভাল হয়।প্রথমে পুকুরকে শুকিয়ে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করে ভাল করে মই দিতে হবে।তারপর শ্যালু বা ডীপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে পানি দিয়ে পুকুর ভরতে হবে।এভাবে নার্সারী পুকুর তৈরীর পর ব্র“ড মাছের পুকুর থেকে বাচ্চা ধরে লালন পালন করতে হবে।খাবার হিসাবে নার্সারী খাবার এবং স্টার্টার খাবার দেয়া যেতে পারে। ৩০/৪০ গ্রাম ওজনের হলে ডিম্ব ও পায়ুপথ দেখে শনাক্ত করা যায়।অবশ্য এ ক্ষেত্রে একটু দক্ষতার প্রয়োজন হয ।পুরুষ মাছের জননেন্দ্র একটু লম্বাটে হয়ে থাকে।আর স্ত্রী মাছের ডিম্বপথ গোলাকার হয়ে থাকে।পুরুষ মাছ হলে জননেন্দ্রটি লম্বা হওয়ার পাশাপাশি ২ টি ছিদ্র দেখা যায়।অর্থাৎ কোন তেলাপিয়ার জননেন্দ্রিয় লম্বা ও ২টি ছিদ্র থাকলে সেটি পুরুষ তেলাপিয়া আর ৩ টি ছিদ্র থাকলে সেটি স্ত্রী তেলাপিয়া ।তেলাপিয়াকে উল্টোভাবে হাল্কাভাবে চেপে ধরলে কয়টি ছিদ্র তা সহজেই শনাক্ত করা যায়।এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরুষ তেলাপিয়া শনাক্ত করা যায়।কিন্তু এ কাজটি করতে একটু ধৈর্য্যরে প্রয়োজন।একটা একটা করে পুরুষ মাছ শনাক্ত করেই কেবল পুরুষ তেলাপিয়া উৎপাদন করা যায়।অন্যকোন প্রক্রিয়ায় এটা করা যায় না।এ প্রক্রিয়াটি একটি জটিল পদ্ধতিও বটে। এ ছাড়া এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় একটু বেশী লাগে।

২. হরমোন প্রয়োগ পদ্ধতি- হরমোন প্রয়োগ পদ্ধতিতে মনোসেক্স বা পুরুষ তেলাপিয়া উৎপাদন করতে হলে প্রথমে ২০/২৫ শতাংশের একটি ব্র“ড মাছ পালনের পুকুরের প্রয়োজন হবে।প্রথমে জানুয়ারী মাসের শেষ দিকে পুকুরটিকে শুকিয়ে কাদাযুক্ত মাটিতে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।তার ৩/৪ দিন পর অগভীর বা গভীর নলকুপ দিয়ে ৩ ফুট পরিমান স্বচ্ছ পানি দিতে হইবে।এর পর প্রতি শতাংশে ১০০/১৫০ গ্রাম ওজনের ২৫ টি স্ত্রী মাছ এবং ১২ টি পুরুষ মাছ একত্রে পুকুরে ছাড়তে হবে।এখানে পুরুষ মাছ ৮ টি দিলেই চলত কিন্তু একসাথে বেশী সংখ্যক মাছ ডিম পারার জন্য পুরুষের সংখ্যা বেশী দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পুকুরে তেলাপিয়ার ব্রুড মাছ ছাড়ার পর সম্পূরক খাবার দিতে হইবে।আজকাল বাজারের যে কোন কোম্পানীর ভাসমান খাবার দিলেই চলবে।শরীরের ওজনের ৩% হিসাবে খাবার দেয়া আবশ্যক।এভাবে খাবার দেয়া হলে ২ সপ্তাহের মধ্যেই ব্রুড মাছগুলো বাচ্চা দেয়া শূরূ করবে। প্রথমবার বাচ্চা দেয়ার পর মা মাছ গুলোকে আলাদা করে অন্য একটি পুকুরে অথবা পুকুরে স্থাপিত হাপায় স্থানান্তর করতে হবে। বেশী পরিমান বাচ্চা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আগে থেকেই আরেকটি পুকুরে শুথু মা মাছ লালন পালন করলে ২য় বার বাচ্চা সংগ্রহ করা সহজ হয়।যেমন একটি পুকুরে পুরুষ ও স্ত্রী মাছ একত্রে দেয়ার পাশাপাশি আরেকটি পুকুরে শুধু স্ত্রী মাছ লালন পালন করতে হবে। প্রথম পুকুরে বাচ্চা দেয়া শেষ হলে প্রথম পুকুরের শুধু পুরুষ মাছগুলোকে ২য় পুকুর অর্থাৎ যে পুকুরে শুধু স্ত্রী মাছ ছিল সেই পুকুরে পুরুষ মাছগুলোকে ছেড়ে দিতে হবে। তা হলে ১০ দিনের মধ্যেই আবার ২য় পুকুরে বাচ্চা দেয়া শুরু করবে।পালাক্রমে এ ব্যবস্থা নিলে প্রচুর পরিমানে বাচ্চা সংগ্রহ করা যাবে।

বাচ্চা সংগ্রহের কৌশল- পুকুরে তেলাপিয়ার ব্রুড মাছ ছাড়ার পর পুরুষ মাছগুলো পুকুরের অগভীর স্থানে গর্ত করে এবং স্ত্রী মাছকে ডিম ছাড়ার আমন্ত্রন জানায়।প্রাপ্ত বয়স্ক পরিপূর্ন ও পরিপক্ক ডিম ভর্তি স্ত্রী মাছ পুরুষের আমন্ত্রনে গর্তে আসে এবং ঐ গর্তের মাটিতে ডিম ছাড়ে এবং তারপর পুরুষ মাছ ঐ ডিমে শুক্রানু দিয়ে ডিম নিষিক্ত করে।তারপর স্ত্রী মাছটি এ নিষিক্ত ডিমগুলোকে তার মুখের ভিতর পুরে নেয়। এই সময় মা মাছ তার বাচ্চাকে সুরক্ষিত রাখার তাগিদে ৮/৯দিন কোন খাবার খায়না এইভাবে মুখের ভিতর ৬/৭ দিন থাকার পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে থাকে। তারপর স্ত্রী মাছটি তার মুখের ভিতর থেকে প্রথমে বাচ্চাগুলোকে পুকুরে ছেড়ে দিয়ে মা মাছটি কাছাকাছি অবস্থান করে। বিপদ আসন্ন মনে হলে মা মাছটি তার বাচ্চাগুলোকে আবার মুখের ভিতর পুরে নেয়। এইভাবে চলতে চলতে মা মাছটির যখন মনে হবে যে তার বাচ্চাগুলো নিজেরাই চলতে পারবে তখন মা মাছটি তার বাচ্চাগুলোকে স্থায়ীভাবে পুকুরে ছেড়ে দিবে।বাচ্চাগুলো প্রথমে পুকুরের একবারে কিনারায় টাকি মাছের বাচ্চার মত গোল হয়ে একত্রে জড়ো হয়ে কিনারার দিকে চলাফেরা করতে থাকে।এই সময় হাপা বা স্কুপ নেট দিয়ে বাচ্চাগুলোকে একত্র করতে হবে।এই বাচ্চাগুলোতে অল্প কিছু ডিম্বকুসুম থাকতে দেখা গেছে।এই ডিম্ব কুসুম জন্মাবস্তায় তার পেটে থাকে এবং এই অবস্থায় বাচ্চাগলো কোন খাবার খায় না।ডিম্ব কুসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। এজন্য প্রথম দিন বাচ্চা ধরলে মনোসেক্স তেলাপিয়া উৎপাদনে বেশী সহায়ক। এখানে উল্লেখ্য মা মাছ বাচ্চা ছাড়ার পর প্রতি দিনের বাচ্চা প্রতিদিনই সংগ্রহ করতে হবে।প্রয়োজনে সকাল বেলায় একবার বাচ্চা ধরার পর বিকেলে আবার অবশিষ্ট বাচ্চাগুলো ধরে ফেলতে হবে।২ দিন বয়সী বাচ্চা না ধরাই ভাল।এর পরও কয়েকদিনপর কিছু কিছ আগের বযসী বাচ্চাও ধরা পরে। এই অবস্থায় বাচ্চা সংগ্রহ করে .৩ মিমি: নেট দিয়ে ছেকে বড় বাচ্চাগুলোকে আলাদা করে ফেলে দিতে হইবে। সাধারনত সকাল বেলায় অক্সিজেন স্বল্পতার সময় বাচ্চাগুলোএইভাবে ভেসে থাকতে দেখা যায়।তারপর সংগৃহিত বাচ্চাগুলোকে অন্য একটি পুকুরে স্থাপিত হাপায় রাখতে হবে। যা হবে হরমোন প্রয়োগের পুকুর।হরমোন প্রয়োগের পুকুরটিকে নিুবর্ণিত উপায়ে প্রত্তুত করতে হবে।

হরমোন প্রয়োগের পুকুর প্রস্ততি- এই পুকুরটিকে বাচ্চা ধরার আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে।এই পুকুরটি ১০/১৫ শতাংশের আয়তনের হলে ভাল হয়।প্রথমে পুকুরটিকে সেচ দিয়ে শুকিয়ে শতাংশ প্রতি ১ কেজি চুন পানির সাথে গুলে ছিটিয়ে দিতে হইবে।এরপর ভাল করে মই দিয়ে শুকিয়ে নিতে হইবে।তারপর বাচ্চা পাওয়ার সাথে সাথে ঐ পুকুরটি ৩ ফুট পানি দিয়ে ভরতে হবে। পানি অবশ্যই শ্যালু বা গভীর নলকুপের স্বচ্ছ পানি হইতে হবে।পুকুরে যাতে প্লাংটন না জন্মায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।সে ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিলে পুকুরে সহজে প্লাংটন জন্মাতে পারবেনা। পুকুরে পানি দেয়ার পর ৩০/৪০ কেজি ছোট জীবিত শামুক (যা সহজেই সংগ্রহ করা যায়) ঐ পুকুরে ছেড়ে দিতে হইবে। সবুজ প্লাংটন বা ফাইটোপ্লাংটন বিনাশের জন্য শামুক খুবই উপকারী। প্লাংটন বেশী হয়ে গেলে হরমোনের কার্যকারীতা কমে যাবে।এ ছাড়া পুকুরের পাড়ে পানির কাছাকাছি হেলেঞ্চা বা কলমী শাকের গাছ লাগিয়ে পানিতে এর ডগাগুলোকে ছড়িয়ে দিলে ঐ পুকুরে সহজে প্লাংটন জন্মাতে পারবেনা অর্থাৎ পানি পরিষ্কার রাখবে।এইভাবে পুকুর প্রত্ততির পর হাপা স্থাপন করতে হবে। ১০/৭ ফুট একটি হাপায় প্রায় ৫০ হাজার রেনু ছেড়ে ঐ হাপায় হরমোন মিশ্রিত খাবার প্রয়োগ করতে হবে।প্রতি সপ্তাহে হরমোন প্রয়োগের হাপা বদল করে নতুন হাপায় রেনুগুলোকে স্তানান্তর করতে হবে।প্রতি সপ্তাহে এ পুকুরের পানি বদলাতে হবে যাতে প্লাংটনের আধিক্য না থাকে। একদিকে শ্যালু দিয়ে পরিস্কার পানি ডুকাতে হবে আর অন্য দিকে মেশিন বা মটর দিয়ে পানি অপসারন করতে হবে।এমন ভাবে এটা করতে হবে যেন পুকুরের সম পরিমান পানি বদল হয়।এভাবে প্রতি সপ্তাহে একবার করলে মনোসেক্স পোনা উৎপাদনে আর কোন বাধা থাকবেনা।

খাবারের সাথে যেভাবে হরমোন মেশাবেন- খাবারের সাথে হরমোন মেশানোর জন্য এমন খাবার নির্বাচন করতে হবে যেন ঐ খাবার পানিতে ভেসে থাকে। খাবারে প্রোটিনের পরিমান ৩০% এর অধিক হওয়া বাঞ্চনীয়।আজকাল বাজারে পানিতে ভেসে থাকে এরুপ নার্সারী খাবার পাওয়া যায়। হরমোন মিশ্রিত খাবার প্রস্তুতের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন তৈরীকৃত খাবার ৫/৬ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায।যদি ৫/৬ দিন ঐ হরমোন মিশ্রিত খাবার খাওয়ানোর পরও খাবার থেকে যায় তাহলে ঐ খাবার ফেলে দিয়ে নতুন খাবার প্রস্তুত করতে হবে। তা না হলে ১ সপ্তাহের বেশী হলে হরমোনের গুনাগুন নষ্ট হয়ে যাবে। কাংখিত ফলাফল পাওয়া যাবেনা।প্রথমে খাবারকে ফিল্টার নেট দিয়ে ছেকে সামান্য বড় দানাটি আলাদা করে ফেলে দিতে হইবে।ছাকনীকৃত খাবার বাতাস মুক্ত জায়গায় পলিথিনের উপর পাতলা আবরনের মত ছড়িয়ে দিতে হইবে।তারপর ঐ খাবারের উপর ইথাইল আ্যলকোহলে দ্রবীভুত হরমোন খাবারে উপর স্প্রে করে ছিটাতে হবে।প্রতিবার খাবার বানানোর সময় কমপক্ষে ৪ বার স্প্রে করতে হবে।যেমন প্র্রথমবার স্প্রে করার পর খাবারগুলোকে দুই হাতের তালুতে ঘষে ঘষে দিতে হইবে যাতে অ্যালকোহল মিশ্রন খাবারের সাথে মিশে যায়।এই ভাবে মেশানোর পর আবার খাবার ছড়িয়ে দিতে হইবে এবং পুনরায় আগের মত আবার স্প্রে করতে হবে।আবার দু হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে অ্যালকোহল এর দ্রবন খাবারের সাথে মেশাতে হবে। এইভাবে মোট চারবার হরনমোন মিশ্রিত খাবার স্প্রে করে দিতে হইবে।এখানে উল্লেখ্য অনেক হ্যাচারী অপারেটর আধুনিক পদ্ধতিতে মটর বা মেশিনের সাহায্যে হরমোন মিশ্রিত করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে মেশিনের সাহায়্যে খাবার প্রত্তুতের সময় মেশিনের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা অনেক বেশী হয়ে যায় তাতে হরমোনের কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে যেতে পারে। ফলে কাংখিত পরিমান মনোসেক্স পোনা উৎপাদন সম্ভব নাও হতে পারে। এমনবি হরমোন মিশ্রিত খাবার রোদ্রের তাপমাত্রার মধ্যেও শুকানো যাবেনা। কাংখিত পরিমান মনোসেক্স পোনা উৎপাদন করতে বিশুদ্ধ আ্যালকোহল ব্যবহার করা জরুরী। কেননা ইথাইল আ্যলকোহল বিশুদ্ধ না হলে রেনুকে হরমোন মিশ্রিত খাবার খাওয়ালে রেনুতে ব্যাপক মড়ক দেখা দিতে পারে।তাই কমপক্ষে ৯৮% বিশুদ্ধ ইথাইল আ্যলকোহল ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরী।

অ্যালকোহলের সাথে হরমোন মিশ্রনের কৌশল ও মাত্রা - তেলাপিয়ার পুরুষ মাছ উৎপাদনের জন্য ১৭ আলফা মিথাইল টেষ্টোষ্টেরন নামক হরমোন প্রয়োজন। ১ দিনের বয়সী বাচ্চাকে পুকুর থেকে ধরে হাপায় স্তানান্তরের পর ঐ হাপায় হরমোন মিশ্রিত খাবার দিতে হইবে।সাধারনত হ্যাচারীতে তেলাপিয়ার বাচ্চা ফুটানোর পর ৫/৬ দিন হরমোন মিশ্রিত খাবার খাওয়ানোর পরে পুকুরে স্থাপিত হাপায় খাবার প্রয়োগ করা হয়।এক্ষেত্রে হ্যাচারীর কোন হাউজ বা সির্স্টাণ ব্যবহার না করে সরাসরি পুকুরে স্থাপিত হাপায় খাবার দেয়া হয়।প্রথমে একটি ছোট স্প্রে মেশিনের ছোট বোতলে পরিমিত মাত্রায় হরমোন ভরে তারপর ঐ হরমোনের সাথে ইথাইল অ্যালকোহল মেশাতে হবে।অ্যালকোহলে হরমোন দ্রবীভুত হয়ে মিশে যাবে। পরে ঐ হরমোন মিশ্রিত অ্যালকোহল খাবারের উপর কমপক্ষে চার বার স্প্রে করতে হবে। অ্যালকোহলের সাথে হরমোন মেশানোর অর্থ হল এই যে, হরমোন মিশ্রিত অ্যলকোহল খাবারের উপর স্প্রে করার পর অ্যালকোহল উবে গিয়ে খাবারে মধ্যে হরমোন মিশে যাবে। এখানে অ্যালকোহল শুধুমাত্র খাবারে হরমোন মেশানোর মিডিয়া হিসাবে কাজ করে। নীচে ১ কেজি খাবার বানানোর জন্য প্রক্রিয়াসহ উপকরনাদি উল্লেখ করা হল। ১ কেজি খাবারের জন্য প্রথমে দরকার ১ কেজি ভাসমান নার্সারী খাবার। ১ কেজি খাবারের প্রস্তুতের জন্য ৭৫ মি;গ্রা:”১৭ আলফা মিথাইল টেস্টস্টেরন”নামক হরমোন প্রয়োজন। বিশুদ্ধ ইথাইল অ্যালকোহল লাগবে ১০০ মি:লি:।

প্রস্তুত প্রনালী- প্রথমে ১ কেজি নার্সারী খাবার একটি পলিথিন কাগজের উপর পাতলা আবরনের মত ছড়িয়ে দিতে হইবে। স্প্রে বোতলে (এখানে স্প্রে বোতল বলতে ৫০০ মি:লি: প্লাস্টিকের বোতলে সাথে একটি স্প্রে গান সহ বোঝানো হয়েছে) ১০০ মি:লি: ইথাইল অ্যালকোহল ভরে তারমধ্যে ৭৫ মি:গ্রা: হরমোন ( ১৭ আলফা মিথাইল টেস্টস্টেরন নামক হরমোন) মিশাতে হবে। অ্যালকোহলে এই হরমোন দ্রবীভুত হয়ে যাবে। এই হরমোন মিশ্রিত অ্যালকোহলের দ্রবন পলিথিনের উপর প্রস্তুত রাখা নার্সারী খাবারে পর্যায়ক্রমে চারবার স্প্রে করতে হবে। প্রথমবার স্প্রে করার পর দুই হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে মেশাতে হবে। এইভাবে প্রত্যেকবার স্প্রে করার পর দুই হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে মেশাতে হবে। এই ভাবে খাবার প্রস্তুত হয়ে গেল। এই খাবার ঘরের ছায়ায় ৮ ঘন্টা বিছিয়ে রেখে শুকাতে হবে। । এই অবস্থায় প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় হাত দিয়ে নাড়া চাড়া দিতে হবে। তাতে অ্যালকোহল উবে গিয়ে শুকনা খাবার হিসাবে থাকে।কোন অবস্থতেই রোদ্রে খাবার শুকানো যাবেনা।বেশী আদ্রতা সম্পন্ন মেঘলা দিনে খাবার না বানানোই ভাল। মেঘলা দিনে খাবার বাননো হলে খাবারে বেশী আদ্রতা থাকতে পারে।ফলে খাবারে হরমোনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে ।

প্রয়োগ পদ্ধতি- কিভাবে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। বাচ্চাগুলোকে হাপায় রেখে ঐ প্রস্তুতকৃত খাবার দিতে হইবে।দিনে পাচঁবার খাবার দেয়া আবশ্যক। আবার খাবার যেন বেশী না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সাধারনরত রেনুর ওজনের ২০% হারে খাবার দিলেই চলবে।খাবার বেশী হলে হাপায় গ্যাসের সৃষ্টি হয়ে রেনু মারা যেতে পারে। এ জন্য হাপায় এক সপ্তাহ খাবার দেয়ার পর হাপা পরিবর্তন করতে হবে অর্থাৎঐ হাপার রেনু অন্য আরেকটি পরিষ্কার হাপায় স্তানান্তর করতে হবে। খাবার প্রয়োগের প্রথম দিকে রেনুগুলো কম খাবে আর সে জন্য প্রথমদিকে কম পরিমানে খাবার দিতে হইবে। এ ভাবে ২৮ দিন হরমোন মিশ্রিত খাবার খাওয়ালে মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা বা পুবুষ তেলাপিয়া পোনা উৎপাদন হবে। উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় ৯৫% পর্যন্ত পুরুষ তেলাপিয়া উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।উপরোল্লিখিত উপায়ে হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে যে কেউ পুকুরে তেলাপিয়ার মনোসেক্স পোনা উৎপাদন করতে পারবেন।

সুপার পুরুষ পদ্ধতি- সুপার পুরুষ এমনই একটি পদ্ধতি যে, এই পদ্ধতিতে এই জাতীয় একটি সুপার পুরুষ মাছের সাথে যে কোন তেলাপিয়ার স্ত্রী মাছের সাথে প্রজনন করার পর এর সমস্থ বাচ্চাই হয়ে থাকে পুরুষ। এক্ষেত্রে কোন প্রকার হরমোন ছাড়াই জন্মগতভাবেই এরা পুরুষ হয়ে থাকে।অর্থাৎ কোন পুকুরে সুপার পুরুষ ছেড়ে দিয়ে তাতে স্ত্রী মাছ ছেড়ে দিলে তারা বাচ্চা দেয়া শুরু করবে এবং এই বাচ্চাগুলের সবগুলেই পুরুষ বাচ্চা। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং সময় সাপেক্ষ। তবে এ প্রক্রিয়াটি সহজে যাতে করা যায় তার জন্য কাজ করছি। আশা করছি এ প্রক্রিয়াটির একটা সহজ সমাধান দিতে পারব। বিজ্ঞানীদের মতে প্রথমে কিছু তেলাপিয়ার রেনুকে (৩ দিন বয়সী) স্ত্রী হরমোন প্রয়োগ করে সমস্থ বাচ্চাকে স্ত্রী মাছে রুপান্তরিত করতে হবে। তারপর প্রজন্ম পরীক্ষা করে রুপান্তরিত স্ত্রী মাছ সনাক্ত করতে হবে। সনাক্তের প্রক্রিয়াটি হল স্ত্রী হরমোন প্রয়োগের ফলে রুপান্তরিত স্ত্রী মাছ (অর্থাৎ জন্মগত ভাবে যে মাছটি পুরুষ এবং হরমোন প্রয়োগের ফলে স্ত্রী মাছ) অন্য আরেকটি সাধারন পুরুষের সাথে প্রজনন করার ফলে যদি ৭৫%পুরুষ মাছ জন্ম নেয় তাহলে বুঝা যাবে এই স্ত্রী মাছটিই হল রুপান্তরিত স্ত্রী মাছ।এখানে উল্লেখ্য উক্ত ৭৫% পুরুষ মাছের মধ্যে ২৫% পুরুষ মাছ হল সুপার পুরুষ আর যদি স্ত্রী মাছের সাথে আরেকটি পুরুষের প্রজনন ফলে বাচ্চাগুলো অর্ধেক পুরুষ আর অর্ধেক স্ত্রী হয় তাহলে সেটা রুপান্তরিত স্ত্রী মাছ নয়। অর্থাৎ সেটা সাধারন স্ত্রী মাছ।এই স্ত্রী মাছগুলোকে মেরে ফেলতে হবে।উপরেল্লিখিত ২৫% সুপার পুরুষের সনাক্তের জন্য প্রজন্ম পরীক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ এই সমস্থ পুরুষের সাথে স্ত্রী মাছের প্রজননের ফলে সমস্থ বাচ্চাই যদি পুরুষ বাচ্চা হয়ে যায় তাহলে এই বাচ্চা উৎপাদনে ব্যবহৃত পুরুষটিই হল সুপার পুরুষ। এটি একটি জটিল এবং সময় সাপেক্ষ ব্যাপার ।

লেখক: এ,কে,এম,নূরুল হক
স্বত্তাধীকারী-ব্রহ্মপূত্র ফিস সীড কমপ্লেক্স (হ্যাচারী), পুলিয়ামারী,শম্ভূগঞ্জ,ময়মনসিংহ