agrobangla
×

Warning

Error loading component: com_finder,

কুমির

বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। শস্য চাষের সাথে পশু পালন দিন দিন আবশ্যিক হয়ে উঠছে। দেশে গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী লালন করা হয়। আর এরই অংশ হিসেবে প্রাণীজগতের অন্যতম নাম কুমির চাষ দেশে এখন ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এতদিন গার্মেন্টস শিল্প একচেটিয়া দখল করে ছিলো, এরপরে বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিজ পণ্য, মৎস্যজাত ও ওষুধি দ্রব্য। কিন্তু এ ধারাবাহিকতার তালিকায় শ্রীঘ্রই ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বাংলাদেশ ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কুমির চাষ। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই কয়েকগুণ মুনাফা আয় সম্ভব। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত "রেপটাইলস ফার্ম লি." এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কয়েক বছর পরেই এ ছোট খামার থেকে বছরে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চামড়া বিদেশে রপ্তানি সম্ভব।

ময়মনসিংহের মত কুমিরের এ রকম আরেকটি ফার্ম হচ্ছে আকিজ গ্রুপের আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেড।নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে, ঘুমধুম ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা তুমব্রু গ্রামে এটি অবস্থিত। গ্রামটি মিয়ানমার সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি। যেখানে কুমির দেখার পাশাপাশি পাহাড়চূড়া থেকে মিয়ানমারও দেখা যায়। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের উখিয়া টিভি রিলে কেন্দ্রের সামনে দিয়ে গহিন অরণ্যের দিকে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথে গেলে কুমিরের এই বিচরণক্ষেত্র পরিদর্শন করা যায়।
৩০ একরের বেশি পাহাড় ঘিরে কুমিরের এই প্রজননকেন্দ্রটি স্থাপন করেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপের আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেড। ২০০৯ সালের মার্চে কুমির চাষের জন্য পাহাড়ের বিশাল অংশজুড়ে নির্মাণ করা হয় অবকাঠামো এবং বর্তমানে এর কার্যক্রম চলছে।

ব্যবসায়িকভাবে দেশে আগমন
ময়মনসিংহ শহরের অদূরে অবস্থিত ভালুকা একটি ছোট শহর। এর তীর ঘেঁষে মাত্র ১৫ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে "রেপটাইলস ফার্ম লি."। ২০০৪ সালে ডিসেম্বর মাসে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি বয়স্ক কুমির নিয়ে মোস্তাক আহমেদ ও মেজবাউল হকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় এই কুমির ফার্মের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে ৭টি কুমির কিছু দিনের মধ্যে মারা যায় এবং বেঁচে থাকে ৬৯টি কুমির । এগুলোর মধ্যে ১৩টি পুরুষ ও ৫৪টি স্ত্রী কুমির। ২০০৪ সালে প্রথম প্রথম ৩টি বাচ্চা পাওয়া যায়। ২০০৭ সালে বাচ্চার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১টি। বর্তমানে এই সংখ্যা ১৩৯টি। তবে এ বছর ৪০০ বাচ্চা আশা করা হচ্ছে।

খাবার পদ্ধতি
বাচ্চাগুলো খুবই অনুভূতি প্রবণ, বদরাগী এবং অভিমানী। তাই মাত্র একজন ব্যক্তিকেই প্রতিদিন খাবার দিতে হয়। হঠাৎ ব্যক্তির পরিবর্তন হলে বাচ্চাগুলো খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিবে এবং অনাহারে মারা যাবে। ছোট বাচ্চদের প্রতিদিন তাদের শরীরের ২০ ভাগ খাবর দিতে হয়। মুরগির মাংসকে কিমা করে বাচ্চাদের খাওযাতে হয়। বড় কুমিরদের সপ্তাহে একদিন ওজনের শতকরা ২০ ভাগ খাবার দিতে হয়। মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে মুরগির মাংস, তৃতীয় সপ্তাহে গরুর মাংস এবং শেষ সপ্তাহে মাছ খাবার হিসেবে দিতে হয়।
কুমির
চাষ পদ্ধতি
প্রাথমিক খরচ কিছুটা বেশি হলেও সম্পূর্ণ নিরাপদে ও নিশ্চিন্ত পরিবেশে কুমির চাষ বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী। কুমির চাষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রজনন সময়ে কুমিরের প্রতি অধিক যত্মবান হওয়া যেন পুরুষ কুমিরের সাথে স্ত্রী কুমিরের প্রতিযোগিতা না হয়। একটি কুমির সর্বাধিক ৮০টি ডিম দেয় এবং বেশিরভাগ ডিম পাড়ে ঘাসে ও কাদাযুক্ত মাটিতে। ডিম ফুটার সাথে সাথেই তা সংগ্রহ করে ইনকিউবেটরে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষ কুমিরের উৎপাদন চামড়ার কদর বেশি তাই এক্ষেত্রে তাপমাত্রা বেশি দিয়ে পুরুষ কুমিরের চামড়ার কদর বেশি তাই এক্ষেত্রে তাপমাত্রা বেশি দিয়ে পুরুষ কুমিরের উৎপাদন বাড়ানো যায়। বাচ্চা কিছুদিন খুব যত্ম সহকারে ছোট পুকুরে রাখতে হবে। এ সময় খাবারের প্রতি ও ছত্রাক রোগের প্রতি যত্মশীল হতে হবে। কয়েক মাস বয়সের বাচ্চাদের পৃথক পৃথক পুকুরে স্থানান্তর করে নিয়মিত পরিচর্যা করলেই দুই বছরেই চামড়া সংগ্রহ করা যায়।

প্রজনন সময়
কুমির সাধারণত বর্ষাকালে প্রজননে মিলিত হয় এবং এর এক সপ্তাহের মধ্যে ডিম দেয়। একটি কুমির ২০-৮০ টি ডিম দেয়। তবে, ভালুকায় এখন পর্যন্ত গড় ডিম দেয়ার পরিমাণ ৬১ টি যা এ বছর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েচে ৯৪৪টি। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সময় লাগে ৮০ দিন। নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা সম্পূর্ণভাবে থাকলে শতকরা ৮৫ ভাগ বাচ্চা বের হতে সময় বেশি লাগে। মজার বিষয় হলো, তাপমাত্রায় পার্থক্যের কারণে বাচ্চা পুরুষ বা স্ত্রী হতে পারে। তাপমাত্রা ৩১-৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস হলে পুরুষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রী এর কম হলে স্ত্রী বাচ্চা বেশি পাওয়া যায়। কুমিরের জনগণের নাগালের বাইরে রাখতে হয়।

রোগ-বালাই
কুমিরের সাধারণত রোগবালাই হয় না বললেই চলে। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ভালো থাকলে সারা বছর বিনা চিকিৎসায় কুমিরকে সুস্থ রাখা সম্ভব। ছোট কুমিরের ছত্রাক জাতীয় রোগ বেশি হয়। তবে, এই দীর্ঘ ৫ বছরে এ ফার্মে এ ধরনের কোন রোগ দেখা যায়নি। প্রজনন মৌসুমে ও খাবার প্রতিযোগিতার সময় কুমির আহত হতে পারে। এছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে যে, মানসিক ও শারীরিকভাবে ছাড়াও স্থানান্তর ও পরিবহনের সময় যাতে কুমিরের উপর কোন স্ট্রেস না পড়ে।

ব্যবসায়িক লাভ
১) ২০০৯ সালে কুমিরের চামড়া প্রথম বাংলাদেশ হতে রপ্তানি হয়। প্রথমদিকে রপ্তানির পরিমাণ কম হলেও ২০১২ সন নাগাদ এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২ কোটি টাকা।
২) বহির্বিশ্বে ২৫ ডলারে কুমিরের মাংস বিক্রি হয়।
৩) ১২ ডলার দামে বিক্রি হয় ১ বর্গ সে.মি চামড়া।
৪) কুমিরের চামড়া হতে বেল্ট ও লেডিস পার্টস তৈরি হয়।
৫) হাড় হতে পারফিউম তৈরি হয়।
৬) দাঁত হতে গহনা তৈরি হয়।
৭) পায়ের থাবা হতে চাবির রিং তৈরি হয়।
৮) কুমিরের মাংস বেশ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর তাই দেশে ও বিদেশে চাহিদা প্রচুর।

চাষের এলাকা
বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাই কুমির চাষের উপযোগী। তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য কিছু লবণাক্ততা সহনশীল প্রজাতির কুমির রয়েছে। উত্তরবঙ্গের জন্য স্বাদু পানির কিছু কুমির পাওয়া যায়। তবে এই ফার্মে স্বাদু পানির কুমির চাষ করা হয।

বিশেষ সুবিধা
অন্যান্য কয়েক সেক্টরের বিভিন্ন ভাইরাল রোগের চরম আতঙ্ক থাকলেও এই সেক্টরে তা একেবারেই নেই। তাই অপার সম্ভাবনার এই শিল্পকে বাংলাদেশে জোরদার করে এবং চামড়া প্রক্রিয়াজাত করলে পোলট্রি ও গার্মেন্টস সেক্টরের মতো এই সেক্টর হতেও ব্যবসায়িকভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তবে সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
উল্লেখ্য, এ ফার্মে যে ইনকিউবেটর ব্যবহার হয়, তা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক। ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা খুব নিখুঁত হওয়ায় এখন পর্যন্ত তেমন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। শীঘ্রই রেপটাইলস ফার্ম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
এগ্রোবাংলা ডটকম