agrobangla

বাঁশ বহুল ব্যবহৃত একটি উদ্ভিদ। এ যাবৎ বাংলাদেশে ৩৫ প্রজাতির বাঁশ শনাক্ত করা হয়েছে। টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে বাঁশের চারা উৎপাদন অতি হালের খবর। জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বাঁশের কচি অংশ, কঞ্চির পর্ব (পর্ব মধ্যসহ) সুবিধামতো কেটে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফাইটো-হরমোনের উপস্খিতিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে বাঁশের চারা উৎপাদন করা হয়। গবেষণাগারে উৎপাদিত চারা পরে মুক্ত পরিবেশে পলিব্যাগে স্খানান্তর করা হয়।

পল্লী এলাকার ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্রসহ শহরাঞ্চলে শৌখিন আসবাবপত্র তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। বাঁশের কচি পাতা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাঁশের অব্যবহৃত অংশ ও ব্যবহার-পরবর্তী অংশ উৎকৃষ্ট মানের জ্বালানি। আমাদের দেশে কাগজ শিল্পে বাঁশের ব্যবহার অনস্বীকার্য। কর্ণফুলী পেপার মিল সম্পূর্ণ বাঁশনির্ভর।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঁশের ভুমিকা অনস্বীকার্য। বাঁশ বাতাসের মুক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং আমাদের জীবন বাঁচাতে অত্যাবশ্যকীয় গ্যাসীয় উপাদান অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেয়। ভূমিক্ষয়রোধসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য উদ্ভিদের চেয়ে বাঁশের ভূমিকা বেশি বলে ধরে নেয়া যায়। কারণ অন্যান্য উদ্ভিদের তুলনায় বাঁশ বেশি স্খিতিস্খাপক। এ ছাড়া বাঁশের শক্ত এবং জট পাকানো শিকড় নদী ভাঙনসহ ভূমিক্ষয় রোধে বেশি কার্যকরী।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাঁশবন বিশাল ভূমিকা পালন করে। বৃহদাকৃতির বাঁশ বাগানে বকসহ নানা প্রজাতির পাখি বাসা বাঁধে এবং তাদের জন্য বাঁশ বাগানই অভয়ারণ্য। একটি আদর্শ বাঁশবন একটি ইকোসিস্টেম তুল্য।

বাঁশের ভেষজ গুণাগুণ আছে বলে লোক মুখে শোনা যায়। উল্লেখ্য, কচি বাঁশের সবুজ ত্বক গুঁড়ো করে চুন মিশিয়ে কাটা ঘায়ে লাগালে রক্তক্ষরণ বìধ হয় এবং কাটা ঘা তাড়াতাড়ি শুকায়।

চাষপদ্ধতি : বাঁশ বাগান তৈরির জন্য প্রথমে জমি নির্বাচন করতে হবে। উঁচু জমি বাঁশ চাষের জন্য উপযোগী। কারণ কুশি গজানোর সময় বন্যা হলে কুশিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। সব প্রকৃতির মাটিতেই বাঁশ জন্মে, তবে বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি বাঁশ চাষের জন্য উপযোগী।

জমি নির্বাচনের পর মার্চ-এপ্রিল মাসে জমি তিন-চারটি চাষ দিয়ে ১০-১৫ দিন ফেলে রাখতে হবে। ওপরের মাটি শুকিয়ে গেলে মই দিয়ে ঢেলা ভেঙে তারপর আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। এরপর ৩ মিটার পরপর এক হাত লম্বা, এক হাত চওড়া ও এক হাত গভীর আয়তনের গর্ত করতে হবে। গর্তটি পাঁচ-সাত দিন রোদে ভালোভাবে শুকাতে হবে। তারপর প্রতিটি গর্তে ১ কেজি পচা গোবর, ৫ গ্রাম টিএসপি ও ৫ গ্রাম এমওপি সার এবং জমির উপরিতলের মাটি ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তটি ভরাট করে ফেলে রাখতে হবে। যখন ভরাটকৃত গর্তের ওপর বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক বা আগাছা জন্মাতে শুরু করবে তখন বাঁশের চারা রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের সময় অবশ্যই পলিব্যাগ খুলে নিতে হবে। গরু-ছাগল যাতে ক্ষতি করতে না পারে সে জন্য বেড়া দিতে হবে।

রোপণ-পরবর্তী নিয়মিত সেচ দিতে হবে। তবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে সেচের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। বেশি ফলনের জন্য তৃতীয় বছর থেকে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে সেচ এবং বাঁশঝাড়ের গোড়া মাটি দিয়ে হালকাভাবে ঢেকে দিতে হয়। পঞ্চম বা ষষ্ঠ বছর থেকে প্রতি বছর পরিপক্ব বাঁশ আহরণ করা যায়।

এক একর জমিতে বাঁশ লাগানো যাবে ৫০৭টি। পঞ্চম বছর থেকে প্রতি বছর প্রত্যেক ঝাড় থেকে কমপক্ষে ছয় থেকে আটটি পরিপক্ব বাঁশ পাওয়া যাবে। টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে প্রাপ্ত প্রতিটি চারার দাম ২৫ টাকা হলে ৫০৭টি চারার দাম ১২ হাজার ৬৭৫টাকা।

আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান বাঁশের অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কোনো কোনো অঞ্চল থেকে বেশ কয়েক প্রজাতির বাঁশ বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমতাবস্খায় এক দিকে বাঁশের বিভিন্ন প্রজাতি রক্ষা যেমন জরুরি হয়ে পড়েছে অন্য দিকে কাগজ শিল্পসহ বাঁশের অন্যান্য ব্যবহার সচল রাখতে বাঁশের উৎপাদন জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাঁশবাগান তৈরির জন্য আস্ত বাঁশই চারা হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। সাধারণত ৭-১০ মাস বয়স্ক বাঁশ চারা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, গতানুগতিক পন্থায় বাঁশ লাগালে বাঁশের প্রতিটি চারার ক্রয় মূল্য হয় প্রায় ২০০-২৫০ টাকার কাছাকাছি। আস্ত বাঁশ চারা হিসেবে ব্যবহার করলে সে চারা পরিবহনের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেয়। রোপণ-পরবর্তী সময়ে ঝড়ঝাপটা থেকে রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সে জন্য বাঁশের গোড়ার দিকে তিন-চার হাত রেখে বাকি অংশ কেটে ফেলা হয়। এতে বাঁশের চারা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেক চারা রোপণের পর মারা যায়। কিন্তু টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনে এসব ঝামেলা এড়ানো সম্ভব। টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা জীবিত থাকার হার ১০০ ভাগ। প্রতিটি চারা উৎপাদনে খরচও হবে কম। মাত্র ২৫ টাকা। তা ছাড়া বৃহত্তর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গতানুগতিক পদ্ধতিতে একযোগে কয়েক হাজার চারা বাঁশ পাওয়া বেশ কষ্টকর, কিন্তু টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে তা লাঘব করা সম্ভব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্যামল কুমার রায়ের তত্ত্বাবধানে এবং বিজ্ঞান ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বাঁশের চারা উৎপাদনের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এবং চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে চারা উৎপাদনসহ বাঁশঝাড় তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য লবণাক্তসহিষ বাঁশের জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করা হচ্ছে। যেহেতু অন্যান্য গাছের তুলনায় বাঁশ বেশি ঝড়ঝাপটা সহ্য করতে পারে সে জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূল এলাকায় পর্যাপ্ত বাঁশ লাগিয়ে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।
লেখক: মো: শফিউল আলম
এগ্রোবাংলা ডটকম