agrobangla

আজকাল স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অফিসে লাঞ্চ টাইম এবং নাস্তার সময় সবাই বাড়িতে তৈরি ফ্রেশ খাবার খেতে চান। অথচ বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে যাওয়া তারপর ঠিক সময় বের করে খাওয়ায় রয়েছে অনেক ঝামেলা। আবার বেশি গরমে খাবার নষ্ট হয়েও যেতে পারে। বাড়ির ফ্রেশ খাবার যারা দুপুরে বা নাস্তায় অফিসে বসে খেতে চান; কিন্তু টিফিন বঙ্ বয়ে বেড়ানোর ঝামেলা পোহাতে চান না তাদের জন্য এখন ঢাকায় চালু হয়েছে বেশকিছু হোমমেড ক্যাটারিং হাউজ। এসব হোমমেড ক্যাটারিং হাউজ থেকে কম খরচে ফ্রেশ খাবার পাওয়া যায়। এখন দুপুরের লাঞ্চে বা বিকেলের নাস্তায় অফিসে বসেই বাড়ির খাবারের স্বাদ উপভোগ করার ব্যবস্থা যারা করছে তাদের অধিকাংশই কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায় উদ্যোগী মহিলা। অল্প পুঁজি নিয়ে যে কোনো গৃহিণী ভালো আয়ের একটি উৎস হিসেবে এ কাজে হাত লাগাতে পারেন। এ ব্যবসায় খুব বেশি পুঁজির প্রয়োজন নেই। পাঁচ/ছয় হাজার টাকা আর কিছু ভালো খাবার তৈরির হাত থাকলেই সফল হতে পারবেন। এই ব্যবসায় যেসব অফিস বা স্কুলে আপনি খাবার সরবরাহ করতে ইচ্ছুক সেখানে যোগাযোগ করে জেনে নিন খাবার সরবরাহের সুযোগ আছে কিনা, সুযোগ থাকলে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানুন দুপুরের লাঞ্চ বা বিকেলের নাস্তায় তারা কি খাবার খেতে পছন্দ করেন। প্রথম পাঁচ/ছয়জন কাস্টমারকে সন্তুষ্ট করে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করার অর্ডারটা নিয়ে নিন। ভালো খাবার সরবরাহ করতে পারলে আপনাকে আর কষ্ট করে অ্যাডভার্টাইজমেন্টের কাজটি ঘুরে ঘুরে করতে হবে না। ভালো খাবারের সুনাম সবাই করে, দেখবেন পাঁচ/ ছয়জন কাস্টমার থেকে আপনার সুনাম আরো পাঁচ/ছয়জনের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে এক মাসের মধ্যে ব্যবসাকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কাস্টমার পেয়ে যাবেন।

প্রাথমিক শুরু : এই ব্যবসা যদি আপনি শুরু করতে চান তাহলে আপনার আগ্রহ, রন্ধনশিল্পে পারদর্শিতা আর কাস্টমারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য আপনার স্মার্টনেস প্রয়োজন। আর আপনার রান্নার কৌশলকে আরেকটু উন্নত করতে কিংবা বিশেষ কিছু ফাস্টফুড বা বেকারির খাবার তৈরি শিখে নিতে বিভিন্ন রান্নার স্কুল ঢাকায় অনেক হয়েছে। এখানে ক্যাটারিং শিল্পে ও ব্যবসায় আগ্রহী অনেক কর্মনিপুণ মহিলাই বিশেষ কিছু খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এসব রান্না ও ক্যাটারিং শেখানোর স্কুলগুলোর ঠিকানা পত্রিকায় পাবেন। প্রতি সপ্তাহেই এসব স্কুল পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন রাঁধুনী ভর্তি করে থাকে। আপনার বাসার আশপাশে অবস্থিত এমন যেকোনো একটি রান্না শেখানোর স্কুলে ভর্তি হয়ে যান। আগেই বলেছি, এরকম একটি হোমমেড খাবারের ক্যাটারিং ব্যবসায় হাত দিতে আপনার পাঁচ/ছয় হাজার টাকা লাগবে, শুধু খাবার তৈরির উপকরণ কিনা লাগবে। আর যেকোনো ক্যাটারিং হাউজে রান্না শিখতে আপনার লাগবে কোর্স ভেদে দুই থেকে দশ হাজার টাকা। ক্যাটারিং হাউজগুলোতে বেকারি, চাইনিজ, মোগলাই, ইউরোপিয়ান, ইতালিয়ান, দেশী অনেক ধরনের খাবার তৈরিই শেখানো হয়। তবে যে খাবারটি কাস্টমার পছন্দ করবে সেই খাবারটি রান্নাই ভালো করে শিখে নিন। এজন্য বেকারি জাতীয় খাবার যেমন-কেক, স্যান্ডউইচ, সমুচা, সিঙ্গাড়া, কুকিজ তৈরি শিখে নিন। এগুলো তৈরি করতে আপনার ওভেন দরকার হতে পারে। ওভেনের দাম সাত থেকে দশ হাজার টাকার মতো পড়বে।

ব্যবসা বিস্তার : এ ব্যবসার পরিধি আজ বেশ বিস্তৃত হয়েছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিসপাড়া থেকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতেও উঠে গেছে। অনেক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই আজকাল হোমমেড ফুড প্যাকেটে করে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব খাবার পণ্যের মধ্যে রয়েছে_ কেক, কুকিজ, বিস্কুট, দেশজ পিঠা, পনির, লাড্ডু, মোয়া, মুড়ালি, সিঙ্গাড়া, সমুচা, স্যান্ডউইচ ইত্যাদি। এসব খাবার প্লাস্টিকের স্বচ্ছ প্যাকেটে করে বাজারজাত করা সহজ ও অনেকদিন টাটকা থাকে। সিঙ্গাড়া, সমুচা আর স্যান্ডউইচ ভালো প্যাকেটে মুড়িয়ে দিলে দুই থেকে তিনদিন টাটকা থাকে। আর কেক, বিস্কুট, কুকিজ, পিঠা ইত্যাদি খাবার এক মাস থেকে দু'মাসও টাটকা থাকে। ভালো খাবার তৈরি করতে পারলে একটি ডিপার্টমেন্টাল দোকানে খাবার সরবরাহ করেই আপনি ভালো আয় করতে পারবেন। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বাচ্চারা কেক, সমুচা, সিঙ্গাড়া, স্যান্ডউইচ বেশি পছন্দ করে। একই খাবারের মেন্যু পছন্দ হাইস্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি লেভেলের শিক্ষার্থীদের। কিন্ডারগার্টেন স্কুল, হাইস্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আপনার খাবার জনপ্রিয় করতে পারলে দেখবেন আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। ব্যবসা থেকে শুধু লাভই আসতে থাকবে। আর অফিসপাড়ায় খোঁজ নিয়ে দেখুন তারা কি খাবার চাচ্ছে। অনেক সময় অফিসে দুপুরের খাবার প্রয়োজন হতে পারে। দুপুরের খাবারে ভাত, সবজি, মাছ, ডিম, মাংস ইত্যাদি মেন্যু হিসেবে সরবরাহ করতে পারেন। এজন্য আপনাকে সুদৃশ্য টিফিন বঙ্রে ব্যবস্থা করতে হবে এবং খাবার পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য একজন লোকও ঠিক করতে হবে। আরো একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন সবার তরকারির ঝাল নুনের স্বাদ সমান নয়। সেদিকে খেয়াল রেখে হালকা মেজাজের সবার জন্য সহনীয় রান্না করতে হবে। বিকেলের নাস্তায় অফিসে কেক, পিঠা, লুডলস সরবরাহ করতে পারেন। এছাড়া সমুচা, পুরি, পিঁয়াজু, সিঙ্গাড়া, মোগলাই পরোটা বা আপনার নিজের উদ্ভাবিত কোনো হালকা খাবারের মেন্যুও পরিবেশন করতে পারেন।

চাহিদা দেশীয় খাবারের : একটা সময় আমাদের বাঙালি মুখরোচক পিঠা, হালুয়া, লাড্ডু, সন্দেশ, বিদেশি ফাস্টফুড খাবারের জোয়ারে হারিয়ে যেতে বসেছিল। এখন অবশ্য অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এজন্য ক্যাটারিং ফুডের সঙ্গে যেসব সুনিপুণ মহিলারা জড়িত আছেন তাদের অবদানই বেশি। কর্মব্যস্ত এই শহরে ঘরে বসে সময় ব্যয় করে বিভিন্ন উপকরণ জোগাড় করে ব্যয়বহুল পিঠা, হালুয়া, লাড্ডু বানানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে ফাস্টফুড আইটেম সহজেই হাতের পাশের দোকানে পাওয়া যেত। তাই বাঙালি সংস্কৃতি এক সময় ফাস্টফুডে ঝুঁকে পড়েছিল; কিন্তু অনেক ক্যাটারিং হাউজ যখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে পুলি পিঠা, নাড়ু, হালুয়া, মোয়া ইত্যাদি বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবার সরবরাহ শুরু করল তখন আবার এসব খাবারের জনপ্রিয়তা ফিরে আসতে শুরু করল। বাঙালির এসব ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে ও নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আজকাল আগোরা, পিকিউএস, নন্দন, মিনাবাজারের মতো বড় বড় সুপার স্টোরগুলোতেও সম্পূর্ণ হাতে বানানোর বিভিন্ন হোমমেড খাবার পাওয়া যাচ্ছে। এ লিস্টে আছে বিভিন্নরকম ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পিঠা-মালপোয়া, পাটিসাপটা, ফুল পিঠা, পাকোন, পুলি, লবঙ্গ লতিকা, ক্ষিরপুলি ও দুধপুলিসহ নানারকমের পিঠা। সঙ্গে পাবেন হালুয়া। যেমন ঃ গাজর, পেঁপে, বুট ও সবজির হালুয়া। এছাড়া নানা রকম সন্দেশ, নারকেলের নাড়ু, চিড়ার নাড়ু, তিলের নাড়ুসহ নানারকম লাড্ডু ও মিষ্টি। এগুলোর দামও ক্রেতার নাগালের মধ্যেই। যেমন প্যাকেটপ্রতি লাড্ডু ৭৫ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, হালুয়া ৬৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা ও পিঠা প্রকারভেদে ৫৫ টাকা থেকে ১৮০ টাকা। আজকাল তরুণ বয়সী ফাস্টফুড জেনারেশনের কাছেও এসব খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসব মুখরোচক বাঙালি খাবার সরবরাহ করছে এর মধ্যে রয়েছে সুরকন্যা, বিক্রমপুর, পিঠাসর, প্রোটিনা, ফ্রেশ, হোমমেড, কেএনটি গার্ডেন ইত্যাদি। সারাবছরই এসব খাবারের চাহিদা থাকে।
বি.দ্র: ব্যাবসাটি পুরোপুরি কৃষি ভিত্তিক না হলেও, কৃষি থেকে একেবারে দুরে নয় কিস্তু! (এগ্রোবাংলা)।
তথ্যসূত্র: দৈনক বাংলাদেশ প্রতিদিন